ব্লগারের পরিচয়

My photo
কোলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, India

Sunday, 8 June 2008

শিরোনামহীন কবিতা


কাঠ জ্বলে কয়লা হয়ে যায়
কয়লা পুড়ে হয়ে যায় ছাই
হৃদয় জ্বলেপুড়ে হয়না কিছুই
না ধোঁয়া না পড়ে রয় ছাই

কথা দিয়েছিলে যা সবই মনভোলানো
মন ভুলিয়েছিলে যা'বলে তা সব সাজানো
জানিনা সারবে কবে সে চোট পুরানো
কবে ফিরে পাবো সে মন হারানো

বরফ গলে জল হয়ে বয়ে যায়
মেঘ হয়ে তা আকাশে ভেসে বেড়ায়
তীর হৃদয়ে এমনই বিঁধে রয়
না গলে যায়রে না উড়ে যায়

Tuesday, 13 May 2008

অভিমান

আমি আজও রেখেছি তোমাকে দেয়া- না বলা প্রতিশ্রুতি
দূর থেকে নিরবে আজও ভালবাসি- চাইনি কখনও ক্ষতি
আঘাত দিয়েছি, আঘাত পেয়েছি- পারিনি করতে ঘৃণা
থেকো ভালো এই ছিল- সদা মোর কামনা
দূরে সরে গিয়ে করেছি পুরণ- তোমার মনোবাসনা
জানি একদিন বুঝবে তুমি- আমার ছিলনা কোনো ভান
হয়তো সেদিন রবোনা আমি- রবে শুধু নিরব অভিমান

Sunday, 23 March 2008

বন্ধু তুমিও?

তোমার সেতারে যে তার বেঁধেছিলাম আমি,
চাওনি তুমি শুনুক কেউ সে সুরের ঝংকারখানি,
পেয়েছো ভয় হবে বোধহয় বদনাম ও পারিবারিক মানহানি।

মুখ ফুটে বলতে একবার শুধু তুমি পাওনা কাউকে ভয়,
আমি যে শুধু তোমারি, তুমি ছাড়া এ জীবনে আর কেউ আমার নয়,
লড়তাম আমি সবার সাথে করতাম বিশ্বজয়।

চেয়েছিলাম মিত্র হতে কিন্তু আমার ভাগ্যের একি পরিহাস হায়,
সেই ভুলে ভরা গল্প- কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়,
অসফল হয়েছি আমি বার বার কিন্তু শুধুই কি নিজের ইচ্ছায়?

Wednesday, 19 March 2008

একটি অতৃপ্ত আত্মার জবানবন্দি

মাঝ রাতে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। সারা শরীর ছটফট করছে, হৃদ্‌স্পন্দন প্রচণ্ড তীব্র। না পারছি শুতে, না পারছি বসতে। ঘাড় এবং মাথায় চাপ ধরা ব্যথা। চোয়ালটা যেন কেমন শক্ত হয়ে আসছে। শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। এই চরম অস্বস্তিতে আর থাকতে পারছিনা। মনটাকে প্রচণ্ড একটা মৃত্যুভয় গ্রাস করে নিচ্ছে। আর বিছানায় থাকতে পারলাম না। অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে কোনোরকমে মশারি সরিয়ে খাট থেকে নেমে এলাম। টালমাটাল পায়ে অন্ধকারের মধ্যে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে খাবার ঘর এবং বসার ঘর পেরিয়ে যেতে চাইছিলাম মা বাবার ঘরে। মা-কে ডেকে বলতে চাইছিলাম - "মা, আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে ..."। কিন্তু নাহ্‌, যেতে পারলাম না। দরজার কাছে এসে পড়ে গেলাম। অর্ধেক শরীর আমার ঘরে, বাকী অর্ধেক খাবার ঘরে। অনেকক্ষণ কোনো হুশ নেই।
এইভাবে কতক্ষণ যে পড়ে আছি, জানিনা। হঠাৎ খুব শীতের অনুভুতি হতে লাগল। তারপর একসময় আর কোনো অনুভুতি নেই। তারপর উঠে দাড়ালাম। মেঝেতে কালচে মত চটচটে কী যেন একটা তরল পড়ে ছড়িয়ে আছে? চটচটে তরলটা এড়িয়ে কিছুটা সরে আসলাম। ভাল করে দেখবার চেষ্টা করলাম। দরজার কাছে কে যেন পড়ে রয়েছে? কেমন চেনা চেনা লাগছে! হ্যাঁ, একে তো আমি চিনি। কতবার আয়নায় দেখেছি এর প্রতিচ্ছবি। এ তো আমি। কী আশ্চর্য! নিজেকে নিজে দেখছি কি করে? সামনে কোন আয়না তো নেই। আমি এমনভাবে মেঝেতে শুয়ে রয়েছি কেন? নাক দিয়ে মুখ দিয়ে কালচে লাল মত তরলটা গড়িয়ে মেঝে ভেসে যাচ্ছে।
এবার সম্বিত ফিরলো। বুঝতে পারলাম- আমি আর নেই। মানে, আমার দেহের মৃত্যু হয়েছে। এখন আমি হলাম শুধুই এক অতৃপ্ত আত্মা।
সব কিছু কেমন অদ্ভুত লাগছে। নিজের মৃত্যুতে, চরম অতৃপ্তিতে নিজেরই কাঁদতে ইচ্ছে করছে। বাবা মা'র ঘরে যেয়ে দেখি ওরা ঘুমাচ্ছে। এই তো সবে তিন ঘন্টা আগে ওরা শুতে গেল। ওদের ডাকতে গিয়েও আর ডাকতে পারলাম না। থাক না আরেকটু ঘুমিয়ে, খুব মায়া হল। প্রথম সন্তানের মৃত্যু শোক ওরা কিভাবে সইবে? শেষবারের মত মা'র পাশে শুতে ইচ্ছে করল। মা'কে জড়িয়ে ধরে ডাকতে ইচ্ছে করল - "মাআআআ"।
এত কাছে মা'কে কোনো দিনও পাইনি। বেঁচে থাকতে, ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, মা অফিসে যাবার জন্য তৈরি। ইস্কুল থেকে এসে বিকালে, ঢেকে রেখে দেওয়া খাবার নিজে হাতে বেড়ে নিয়ে খেয়ে, মা'র ছেড়ে যাওয়া শাড়ীটাকে পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঐ শাড়ীটাতে একটা অদ্ভুত সুন্দর মা মা গন্ধ থাকতো।
পাশ ফিরে বাবার দিকে তাকালাম। দুঃখে গলা বন্ধ হয়ে গেল। বাবাকে জড়িয়ে কেঁদে বললাম - "বাবা, আমি তোমার কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। আমি সত্যই Good for nothing."
একী! কেউ কিছু টের পাচ্ছে না কেন? ওওও! টের পাবে কী করে? আমি তো শুধুই এক অতৃপ্ত আত্মা।
ভোর হয়ে গেছে, পাখীরা ডাকতে শুরু করেছে, চারিদিক আস্তে আস্তে আলোকিত হয়ে উঠছে। এর পরে সব ঘটনা দ্রুত ঘটতে লাগলো। মা'র ঘুম ভাঙ্গলো। অভ্যেস বসতঃ, চা করতে যাবার আগে মা একবার আমার ঘর থেকে ঘুরে আমাকে দেখে যায়। আজকেও দেখতে এসে ঘুম চোখে দরজার কাছে হোঁচট খেল। নিচে তাকিয়ে দেখে আমি পড়ে আছি। চিৎকার করে উঠে মা, বোন আর বাবাকে ডাকলো। ওরা তিনজনে কোনোরকমে আমার শরীরটাকে ধরে খাটে শুয়ে ডাকতার ডাকলো।
ডাকতার এসে পরীক্ষা করে আমার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিল। একে একে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধবেরা এল। পাড়া-প্রতিবেশীরা এল। হা হা!! এইবার বেশ মজাই লাগছে।
সারা ঘরে ফুল, মালা, ধুপ ও সুগন্ধির গন্ধে ম ম করছে। আর কিছুক্ষণ পরেই আমার শরীরটাকে নিয়ে যাওয়া হবে শ্মশানে। শেষবারের মত নিজেকে দেখছি। কয়েকটা মাছি নাকের কাছে, মুখের কাছে, কানের কাছে বসছে আবার উড়ে যাচ্ছে।
এই তো জীবন! আর কিছুক্ষণ পরে সাধের এই দেহটা দুমুঠো সাদা ছাই হয়ে যাবে।

Sunday, 6 January 2008

চঞ্চলা হরিণী

তুমি চঞ্চলা হরিণী, মনমরা তরুণী
হয়তো বা কোন নিষ্প্রাণ আত্মার সারথি

তুমি এইরূপ, সেইরূপ - সব রূপের সাক্ষী
হয়তো বা হৃদয়ের গভীরে জেগে থাকা বিশ্বস্ত কোন প্রহরী

তুমি দেখেছো পর্বতের অচলতা
দেখেছো সাগরের উন্মাদনা

তুমি গহীন বনের মাঝ দিয়ে হেটে যাওয়া উদ্ভ্রান্ত কোন পথিক,
হয়তো বা অজানা পথে পারি জমানো কোন ভবঘুরে ভাবুক

তুমি অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি
তুমি ক্লান্ত মাঝির সুরেলা কন্ঠের বেদনা ভরা সারি

তুমি দেখেছো আকাশের বিশালতা
দেখেছো পিপাসু মনের সঙ্কীর্ণতা

তুমি এক তীব্র অন্ধকার, প্রচণ্ড এক সঙ্কট
হয়তো বা আলোর মাঝে বাস করা জ্ঞান-তাপস

তুমি ক্লান্ত দুপুরে নিষ্পাপ প্রহরে হঠাৎ গর্জে ওঠা কোন আত্মার চিৎকার,
হয়তো বা শ্রোতা কোন মলিন বিমর্ষ মুখের না বলা কথার

সবশেষে দেখেছি আমি তোমাকে আমার মনের আয়নায়,
জানি না তুমি আসলেই কী? কেবল ভাবি তোমায়
মনে হয় আমরা আছি এক ঋদ্ধ আত্মার অবরুদ্ধ সত্তায়।

Thursday, 27 December 2007

কেউ কথা রাখেনি

কেউ কথা রাখেনি,

৩৩ বছর কাটলো

কেউ কথা রাখেনি।


ছেলেবেলায় এক বোষ্টমি তাঁর আগমণী গান,

হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল -

শুক্লা দ্বাদশীর দিন

অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে,

তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবষ্যা চলে গেল,

কিন্তু সে বোষ্টমী আর এলো না

২৫ বছর প্রতীক্ষায় আছি।


মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল -

বড় হও দাদাঠাকুর,

তোমাকে আমি তিনপ্রহরির বিল দেখাতে নিয়ে যাবো,

যেখানে পদ্মফুলের মাথায়, সাপ আর ভ্রমর খেলা করে।

নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো?

আমার মাথায় ঘরের ছাঁদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে,

তারপর তুমি আমায় তিনপ্রহরের বিল দেখাবে?


একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনও,

লাঠি লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা

ভিখিরির মত চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি -

ভিতরে রাস উৎসব;

অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে

সুবর্ণ কঙ্কন পড়া ফর্সা রমনীরা,

কত রকম আমোদে হেসেছে,

আমার দিকে তাঁরা ফিরেও চায়নি।


বাবা আমার কাঁধ ছুঁইয়ে বলেছিলেন -

দেখিস, একদিন আমরাও ...

বাবা এখন অন্ধ,

আমাদের দেখা হয়নি কিছুই;

সেই রয়্যাল গুলি,

সেই লাঠি লজেন্স,

সেই রাস উৎসব আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না;


বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে,

বরুণা বলেছিল -

যেদিন আমায় সত্যি কারের ভালবাসবে,

সেইদিন আমার বুকেও এরকম আঁতরের গন্ধ হবে।

ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি

দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়

বিশ্ব সংসার তন্য তন্য করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীল পদ্ম

তবু, তবু কথা রাখেনি বরুণা

এখন তাঁর বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ

এখন সে যে কোনো নারী।


কেউ কথা রাখেনি

৩৩ বছর কাটলো

কেউ কথা রাখেনা।।


কবিতা - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আবৃত্তি - শিমূল মুস্তাফা


Tuesday, 20 November 2007

একটি সাম্যবাদী মৃত্যুর কবিতা

তীব্র শৈত্যে জমে যাচ্ছি যে, একটু আগুন দে
কখন নিভেছে গনগনে আঁচ, ছাই ঘেটে দেখ গে

ফুল মালা আর ধুপের আগুন, আগুনের জলসায়
চার বেহারার পালকিতে চেপে কে যায়, জনতার রায়?

পূত-পবিত্র অগ্নি শিখার সে আগুন যাত্রায়
ঘুমাতে চলল অগ্নিপুত্র আগুনের শয্যায়

অগ্নি শিখায় জন্ম তোদের, অগ্নিতে নির্বাণ
বাঁচাটাও ছিল অগ্নিকুণ্ডে কি ভীষণ লেলিহান

বুকের মধ্যে দাবানল ছিল, এখন ভষ্মরাশি
অগ্নি নির্বাপন যন্ত্র কিনতে লগ্নিতে বিশ্বাসী

বিদায় অগ্নি, এখন লগ্নি, জমে যাচ্ছি যে
আবার আগুন হবার আগে একটু আগুন দে।

Tuesday, 23 October 2007

মিলনমেলা

অনেকদিন ধরে হাবিবুর বলে রেখেছিল, দশমীর দিন ফাঁকা রাখতে। প্রথমে কারণটা বলতেই চাইছিল না, অনেক জোরাজুরি করাতে বললো, এক জায়গায় নিয়ে যাবে। আমিও নাছোড় বান্দা। কয়েকদিন পর পরই ঘেন ঘেন করি - "বল না কোথায় নিয়ে যাবে?" শেষে পুজোর ঠিক কয়েকদিন আগে বললো টাকি যাবে, বাংলাদেশ সীমান্তে, ইছামতী নদীতে নাকি দূর্গা ঠাকুর ভাসান হয় (প্রতিমা নিরঞ্জন)। সেই উপলক্ষে উৎসবের পরিবেশ।

টাকিতে হাবিবুরের এক বন্ধু থাকে নাম মজনুর রহমান। আমরা নাকি প্রথমে তার বাড়িতে যাবো, তারপরে সে আমাদের নদীর নৌকা ঘাটে নিয়ে যাবে। আগের রাতে হাবিবুর আমাকে ফোন করে বললো, সকাল ১০:৫৫ তে শিয়ালদহ থেকে শিয়ালদহ-বনগাঁও শাখার ট্রেন ছাড়বে। যেহেতু শিয়ালদহ থেকে ট্রেন আমার বাড়ির কাছের রেল স্টেশন দম দম ক্যান্টনমেন্টে আসতে ১০ মিনিট লাগবে, আমি যেন সেইমত সময় হিসাব করে ১০:৩০ -র মধ্যে তৈরি হয়ে নেই। হাবিবুরের আবার ঐ দিনই কাউকে বিমানবন্দরে ছাড়তে যাবার কথা। আমার বাড়ি বিমানবন্দর থেকে খুব কাছে। তাই ঠিক হল, হাবিবুর আমার বাড়িতে আসবে আর আমরা একসঙ্গে যাবো। প্লেন ছাড়বে সকাল ১১ টায় এবং যাত্রিরা ১০:৩০ টার মধ্যে চেক ইন করবে। যাই হোক, হাবিবুর ওনাকে রওয়ানা করিয়ে ১০:৩০ র মধ্যে আমার বাড়িতে চলে এল। আমি একটু লেট লতিফ টাইপের। ও যখন এল, আমি তখনও তৈরি হইনি, ভাত খাচ্ছিলাম। হাবিবুরও লেট লতিফ টাইপের, ওও তারাতারিতে না খেয়ে চলে এসেছে। আমাকে খেতে দেখে ওর খিদে বেড়ে গেল। আমার মাকে বললো- "কাকিমা আমিও খাব, আমাকেও ভাত দিন"। দুই জনের খেয়ে রওয়ানা দিতে দিতে পৌনে এগারোটা বেজে গেল। আমার বাড়ি থেকে বেরিয়েই দুই পা দূরে স্টেশন যাবার রাস্তা। অটো রিকশার জন্য দাঁড়ালাম। দুটো ভর্তি অটো চলে যাবার পর যখন ব্যস্ত হয়ে ট্যাক্সিতে যাবার কথা ভাবছি, এমন সময় একটা ফাঁকা অটো দেখতে পেলাম। অটো সামনে আসার পরে অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম- ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন যাবেন? সে বললো যে না, পরের স্টেশন দূর্গানগর যাবে। আমরা অনন্যোপায় হয়ে যেতে রাজি হয়ে গেলাম, কিন্তু মনে ভয়ও হচ্ছিলো, ট্রেন মিস করতে পারি, বা ট্রেন গ্যালোপিং হলে ঐ স্টেশনে নাও থামতে পারে। যাই হোক, দশ মিনিটের মধ্যে দূর্গানগর স্টেশনে পৌছে গেলাম। টিকিট কাটতে গিয়ে শুনি, ট্রেন শিয়ালদহ থেকে ১০:৫৫ না ১১:৫৫ তে ছাড়বে। হাবিবুর বললো, তাহলে হয়ত মজনুর বলতে ভুল করেছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এই স্টেশনে দাঁড়িয়ে না থেকে, পরের যেকোনো ট্রেনে বারাসত চলে যাবো কারণ, বারাসত একটা সদর স্টেশন। ট্রেন গ্যালপিং হলেও বারাসতে অবশ্যই থামবে। সময় মত হাসানাবাদ লোকাল এল এবং আমরা বারাসত থেকে ঐ ট্রেনে উঠে পড়লাম। মজনুরের বাড়ি আসলে টাকি থেকে একটু দূরে নিমদাড়িয়া স্টেশনের কাছে। দুপুর ২:২০ নাগাদ আমরা নিমদাড়িয়া স্টেশনে নেমে পড়লাম। স্টেশনে আমাদের জন্য মজনুর অপেক্ষা করছিল। আমার সাথে মজনুরের পরিচয় ছিল না। পরিচয় সেরে মজনুরের মোটর বাইকে আমারা তিন জনে উঠে পড়লাম। ওর বাড়ি পৌছিয়ে দেখি ঐখানে মজনুরের আরও দুই বন্ধু মাহ্‌রুফ আর তপন। ওদের সাথে পরিচয় পর্ব মিটে যাবার পর, মজনুর বললো- খাবে চল। আমি বললাম- সে কী? আমরা তো খেয়েই এসেছি। ও বললো- সে তো অনেক আগে খেয়েছো। খেতেই হবে, বলে জোর করে দোতলায় নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি মুরগীর মাংস আর ভাতের ব্যবস্থা করে রেখেছে। এতক্ষণের লৌহ শকট যাত্রায় একটু একটু খিদেও পেয়েছিল, তাই কথা না বাড়িয়ে খেয়ে নিলাম। খেয়েই রওয়ানা হয়ে গেলাম টাকির উদ্দেশ্যে। একটা সাইকেল ভ্যান ভাড়া করা হল। ১৫ মিনিটের মধ্যে ইছামতী নদী তীরে উপস্থিত হয়ে গেলাম।

গিয়ে দেখি, প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে ইছামতী সীমান্তে দুই বাংলার মিলনমেলা। দুই পারে হাজার হাজার মানুষ। ইছামতী নদীতে ছিল বাংলাদেশ-ভারতের কয়েক শ রকমের নৌকা আর ট্রলার। ও পারে সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলা। কয়েকঘন্টার মিলনমেলায় হিন্দুরাই শুধু নয়, দুই বাংলার সব ধর্মের মানুষ ভিড় করে।

তপন বেশ করিৎকর্মা ছেলে ও-ই বড় একটা মোটর নৌকাতে আমাদের যাবার ব্যবস্থা করলো।

এলাকাবাসী থেকে জানলাম, দেশ বিভাগের অনেক আগে থেকেই ইছামতী নদীর উভয় তীরে দুর্গাপূজার শেষ দিন বিজয়া দশমীতে মেলা বসে আসছে। দেশ বিভাগের পরও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি দুই বাংলার সীমারেখা। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে এ মেলা কখনো বন্ধ হয়নি। সারা বছর ধরে শুধু ইছামতী নদীর পারের মানুষ নয়, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এ দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে ইছামতীর উভয় পারে বসে নানা রকমের দোকান। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ছাড়াও এখানে আসা মানুষ কিছু কেনাকাটা করে সন্ধ্যার পরে ফিরে যায় যে যার দেশে, যে যার ঘরে।

ভারতের পাশে টাকী আর বাংলাদেশের পাশে দেবহাটা, মাঝখান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে বয়ে যাওয়া সীমান্তনদী ইছামতী বিভক্ত করেছে দুই দেশকে। ইছামতীতে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যতদুরে চোখ যায় ভেসে বেড়াচ্ছে নৌকা আর নৌকা। নদীতে বাংলাদেশের জলসীমানায় টহল দিচ্ছে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) স্পিডবোট আর ভারতের জলসীমানায় টহল দিচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) স্পিডবোট। নদীতীরে দাঁড়িয়ে আনন্দ উপভোগ করছে কয়েক হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য বসে অন্য রকম মেলা, সৃষ্টি হয় অন্য রকম দৃশ্য। এখানে না এলে বিশ্বাস করা কঠিন এ মিলনমেলার অনুভুতি। আমার সব থেকে ভালো লেগেছে উভয় দেশের নৌকা থেকে ছুড়ে ছুড়ে উপহার (লজেন্স, আখ, সসা, কলা, পলিথিন পাউচে জমানো শরবতের বরফ, সিগারেট, খুচরা পয়সা ইত্যাদি) বিনিময়। উভয় দেশের সাধারণ মানুষের আন্তরিকতায় আমি যারপরনাই মুগ্ধ।

স্থানীয় অনেকে বলেন, ‘বিজয়া দশমীতে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে ইছামতীর তীরে দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলা বসে। এটি এখন আমাদের সাংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। এখানকার অন্যরকম আনন্দ উপভোগ করতে প্রতিবছর ছুটে আসি।’

দীর্ঘদিন ধরে উভয় দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সীমান্তনদী ইছামতীতে প্রতিমা বিসর্জন দেয় (এখন অবশ্য হিন্দু জনসংখ্যার প্রধান অংশ ভারতে চলে যেতে বাধ্য হওয়ায় এবং নানা কারণে বাংলাদেশে দূর্গাপূজার সঙ্খ্যা অনেক কমে গেছে)। এ উপলক্ষে যে মেলা বসে সেখানে অংশ নেয় দুই দেশের হিন্দু-মুসলমান কয়েক হাজার মানুষ। বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এ প্রথা।

সন্ধ্যাবেলায় শুরু হল আকাশে আতসবাজির খেলা। ফেরার সময় নদীর পারের রাস্তা দিয়ে আমরা যখন ফিরছি, তখন ভিড়ের চাপে পিষ্ট হবার জোগাড়।


পুনশ্চঃ আমার মা এবং বাংলাদেশের আমার এক প্রিয় বন্ধু প্রতিজ্ঞা এবং কসম খাইয়েছিল আমি যেন নৌকাভ্রমণ না করি। তাদের কথা না রাখার জন্য দুঃখিত। আসলে বন্ধুরা চাপ দেওয়াতে নৌবিহার করতে রাজি হয়ে যাই, কারণ আমি না গেলে ওদেরও যাওয়া বন্ধ হয়ে যেত আর আমরা যে এত আনন্দ করেছি, সেইটাও হত না। মরতে তো একদিন হবেই, তা বলে রোজ রোজ ভয়ে বেঁচে থাকায় কোনো মজা নেই। জীবনে একটু আনন্দ-উত্তেজনা ভালো। তা বলে আমরা বেপরোয়া হইনি। দূর্ঘটনা এড়াতে বড় নৌকা ভাড়া করেছিলাম। ছোট নৌকাতেই দূর্ঘটনা বেশী হয়, এবং আমাদের চোখের সামনে হয়েছেও।


















আরও ছবি দেখতে ক্লিক করুন:


বাংলাদেশের কিছু তথ্য সংগৃহীত দৈনিক প্রথম আলো থেকে।

Thursday, 18 October 2007

রেশমী ও সুস্মিতের গল্প


সুস্মিত একটু বোকা আবোধা প্রকৃতির ছেলে, কোনো কিছুই সে চট করে বুঝতে পারে না। সামান্য জিনিস বুঝতেও তার অনেক সময় লাগে। রেশমীর ব্যাপার স্যাপার, মন মেজাজ সে আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। একেতেই নারীর মন, বড়ই জটিল, দেবা না জানন্তি। তার উপর রেশমী কখন হেসে ওঠে, কাঁদে, আহ্লাদ করে, এই রোদ তো এই মেঘলা, সুস্মিত কিছুই ধরতে পারে না। সুস্মিত আগে তো কিছুই বুঝতে পারতো না, কিন্তু আস্তে আস্তে সুস্মিত একটু একটু করে বোধসম্পন্য হচ্ছে, চালাক হচ্ছে। এখন সে অনেক কিছুই ধরতে পারে রেশমীর আচরণ, ব্যবহার। সুস্মিত উপলব্ধি করতে পারে - রেশমী কথায় কথায় কারণে অকারণে হাসছে মানে রেশমীর মন ভাল নেই, বা কাঁদছে মানে রেশমী একান্তভাবে সুস্মিতকে পেতে চাইছে, বা সুস্মিতকে খুব গালমন্দ করছে, আচড়ে দিচ্ছে, খামচে দিচ্ছে, নাক কান টেনে দিচ্ছে মানে আহ্লাদ করছে।
অনেক সময় অকারণে রেশমী সুস্মিতের সাথে ইচ্ছে করে পায়ে পা লাগিয়ে এমন ঝগড়া করে, সুস্মিত বুঝে উঠতেই পারে না যে সে কী এমন করলো। আসলে কারেন্ট অফ না হলে সুন্দর জোৎস্না বোঝা যায় না, রেশমীও অকারণে ঝগড়া করে দেখে নিতে চায় সুস্মিত তাকে ঠিক কতটা ভালবাসে।

*** *** *** *** ***

সুস্মিত এক মধ্যবিত্ত বাঙ্গালি হিন্দু পরিবারের ছেলে। আর রেশমী এক উচ্চবিত্ত বাঙ্গালি মুসলমান পরিবারের মেয়ে। তারা বাঙ্গালি, এইটাই তাদের মুখ্য পরিচয় হবার কথা কিন্তু তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে কে হিন্দু আর কে মুসলমান এইটা বলার কী দরকার? দরকার ছিল না, কিন্তু কতিপয় সুযোগসন্ধানী ও অবাঙ্গালির দ্বিজাতিতত্ত্বের জন্য সমগ্র বাঙ্গালি জাতি আজ দ্বিধাবিভক্ত। বাঙ্গালিত্ব আজ গৌন, ধর্মই মুখ্য হয়ে দাড়িয়েছে। ভালবাসাটা যেন অভিশাপ আর সেটা যদি হয় গরীবের আর বড়লোকের, আর সেটার গায়ে যদি ছাপে হিন্দু-মুসলমানের ছাপ। প্রেম তো তাদের জন্য নয়, যেন বড়লোকের কেনা জায়গির। সুস্মিত প্রেম করেছিল রেশমীর সাথে, মেয়েটি ভীষণ সিধা সাদা নিরহঙ্কার। সুস্মিত মুগ্ধ চোখে তাকিয়েছিল তার নিষ্পাপ মুখের দিকে। তখনও তো সে জানতো না, কি আছে তার মনের ভিতর। ছিল শান্তি আর সুখ যা ছুতে পেরেছিল সুস্মিত। চেয়েছিল ধরে রাখতে সারা জীবন ধরে। মেয়েটি চোখ নামিয়ে বলেছিল - আমার নাম রেশমী। সেই দিন থেকেই শুরু তাদের সুখের স্বপ্ন দেখা। ভুলে ছিল কিছুদিন কত কষ্ট কত জ্বালা, ভেবেছিল তারা জয়ী, গড়বে সুখের বাসা। তখনও তারা জানতো ঠিক পথ ধরেই চলছে। তারা যে সমাজের শিক্ষিতের দল, জাত ধর্মে বিশ্বাস করে না। কে বড়লোক আর কে গরীব, পরোয়া করে না। শিক্ষা তাদের সম্পদ যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। বরং স্পর্শ করবে, আলোকিত করবে অন্ধকার। তারা হবে সমাজের দৃষ্টান্ত, তাদের দেখবে সারা সমাজ। তারা থাকবে তাদের নিজেদের ধর্ম নিয়ে, কেউ ধর্মান্তরিত হবে না কারণ তারা বিশ্বাস করতো ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে না।

এই তো অল্প কিছুদিন আগের কথা। রেশমী নামের ছোট মেয়েটা বড় হয়ে উঠতে লাগলো। আর বড় হতে হতে একটা সময় আসে যখন মনে হয় নদী শরীরের ভিতরেই বইছে, গোলাপের কুঁড়ি ফুটছে নিজের অন্দরে, চাঁদ ওর জোৎস্না ঢালছে তারই জন্য। চারিদিকে বাবা-মা, ভাই-বোন, কাকা-কাকি, ফুপু-খালা ঘিরে থাকলেও চোখ দুটো ছটফট করে খোঁজে প্রিয়তমকে, যে তার মনে তুলবে সুরের মুর্চ্ছনা, অঙ্গে অঙ্গে বাজাবে বাঁশি। রেশমীরও হল সে হাল। আর, ওমা মিলেও গেল এক পুত্তুর! না, রাজপুত্তুর নয়, বণিকপুত্তুরও নয়, ভিনধর্মী এক চিত্রকর। তুলি-কলম নয়, সে ছবি আঁকে মাউস ঘষে। সে ছবি ফুটে ওঠে মনিটরে। নড়ে-চড়ে, কথা বলে, সে এক দারুণ ব্যপার। সবাই বলে মাল্টিমিডিয়া এ্যানিমেশন।

আপু, ফুপু, সবাই রেশমীকে বলে, পাগল হলি তুই? কেউ মানবে তোর এই পাগলামি? প্রাসাদের দেওয়ালগুলো ফিস ফিস করে বলে, সাবধান রেশমী! জানো না, ওর কী হয়েছিল? তার কী হয়েছিল? রেশমী জানে, এ সব জেনে তার লাভ নেই। সে তো তার মন আর শরীরকে জেনেছে, সে আর ভয়কে জেনে করবে কী? সাত পুরুষের পরম্পরা বলে, ছিঃ, এ সব কী? বিধর্মীর ঘরে যাবে আমাদের মেয়ে? প্রেম আবার কী? পরিণয় একটা বিনিময়। রেশমীর বড় ভাইয়েরা এবং তাদের চামচেরা শাসানি দিল সুস্মিতকে, যদি আর কোন দিন রেশমীর সাথে তাকে দেখা যায়, তবে জানে মেরে দেবে।

এদিকে সুস্মিতের আত্মীয়-পরিজনেরাও ছিঃ ছিঃ করলো। অনেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। মামা-মামিরা তির্যক মন্তব্য করলো। কেউ বললো- যাদের জন্য চোদ্দো পুরুষের ভিটা-মাটি ছেড়ে চলে আসতে হল, তুই কিনা তাদেরই একজনের মেয়েকে ঘরের বউ করবি? সুস্মিত বুঝতে পারে না, কেউ অন্যায় করলে তার খেসারত অন্য কাউকে কেন দিতে হবে?

বাবা বললো- তুমি যা করতে যাচ্ছো, জানো তার জন্য তোমার বোনের বিয়ে নাও হতে পারে। কে এই রকম মেয়ের সাথে তার ছেলের বিয়ে দেবে, যার দাদা কিনা একজন মুসলমানের মেয়েকে ঘরে তুলেছে? সুস্মিত বাক্‌রুদ্ধ হয়ে যায়। একমাত্র মা তার সাথে আছে। মা বলে- বাবা, তুমি যাকে নিয়ে ঘর করলে সুখি হবে, আমি তাকেই মেনে নেব। কারও জন্য তুমি তোমার জীবন নষ্ট করো না। মা'র কথায় সুস্মিত মনে অনেক বল পেল।

*** *** *** *** ***

এই বছর ঈদ-উল-ফিতর ও দূর্গা পূজা কাছকাছি দিনে পড়েছে। রেশমী তার বান্ধবীদের নিয়ে গেছে ঈদের কেনাকাটা করতে এক অভিজাত শপিং মলে। রেশমীর বান্ধবীগুলো এক একটা ফাজ়িলের হদ্দ। সমানে ইয়ার্কি ফাজ়লামি করে যাচ্ছে। কিন্তু রেশমীর সেইদিকে মন নেই। তার চোখ খুঁজছে আরেকজনকে। হ্যাঁ, এই দোকানটার সামনেই তো সুস্মিত থাকবে বলেছিল। কিন্তু কই সে? সে তো কোনো দিনো দেরী করে না। প্রত্যেক দিনই তো সে রেশমীর থেকে এক ঘন্টা, আঁধ ঘন্টা আগে চলে আসে। রেশমীর মনে অনেক দূর্ভাবনা হতে থাকে।
এইদিকে, সুস্মিত আসলে অনেক আগেই চলে এসেছিল, কিন্তু রেশমীর বান্ধবীদের পুরো ব্যাটেলিয়ান দেখে, ঘাবড়ে গিয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। রেশমীর চঞ্চলতা দেখে একটু মজাও পেয়েছে। রেশমীর কাছে, সুস্মিতের অনুযোগ ছিল যে সে রোজই দেরী করে আসে আর তাকে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আজকে সুযোগ পেয়ে সুস্মিত সেই অভিমান উসুল করে নিচ্ছে। কিন্তু সুস্মিতের আর ভাল লাগছে না, রেশমীর অসহায়তা দেখে তার নিজেরও খুব খারাপ লাগছে। নিষ্ঠুরের মত সে আর লুকিয়ে থাকতে পারছে না।
সুস্মিতকে পেয়ে রেশমীর বান্ধবীরা রব তুললো, তাদের রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে হবে। এত জনকে খাওয়াতে হবে দেখে সুস্মিত প্রমাদ গুনলো। সামনে পুজো, সবাইকেই কিছু না কিছু দিতে হবে, পুজোর বোনাস এখনও পায়নি। পাবে কিনা ঠিকও নেই, কোম্পানির যা অবস্থা, বেতনই ঠিক মত হচ্ছে না আবার বোনাস! সুস্মিতের মুখ দেখেই রেশমী ব্যাপারটা বুঝে গেল। সে খেঁকিয়ে বান্ধবীদের ফাজ়লামির সুরে বললো - তোদের লজ্জা করে না? কোথায় আমাদের একটু নির্জনতার মধ্যে প্রেম করার ব্যবস্থা করে দিবি, তা না, কাবাব মেঁ হাড্ডি হতে চাইছিস!
সুস্মিত, রেশমীকে নিয়ে শপিং মলের দোতলায় একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। রেশমী বললো - প্লিজ়, আজকে সবার সামনে বসবো না, চলো আজ একটা প্রাইভেট কেবিনে বসি।


রেস্টুরেন্টটা বেশ ভাল। হাল্কাভাবে একটা হিন্দী গান ভেসে আসছে -
"প্যাহলী বারিশ ম্যায় অর তু,
দূর সে ভিনি খুশবু আয়ে
আব ক্যা হো গা আনজাম
খুদা জানে ..."

সুস্মিত আর রেশমী দুজনের মন-মেজাজটা আজকে খুব রোম্যান্টিক হয়ে আছে।

রেশমী: এই জানো, তোমার ফোন কল পেয়ে আজকে আমার ঘুম ভেঙ্গেছে। আজকে অনেক দিন পর তোমার সাথে দেখা হবে ভেবে সকাল থেকে একটা অদ্ভুত শিহরণ হচ্ছিল। কাল তোমার সাথে কত ঝগড়া করেছি ফোনে, তবুও মনে মনে আশা করছিলাম, তোমার কল আসুক, কল আসুক। তুমি কল করার পরে খালি মনে হয়েছে, তোমাকে কাল কত আঘাত দিয়েছি, কত আবল তাবল কথা বলেছি।

সুস্মিত: বাদ দাও। আমি জানি, কাল তুমি কোনো কথাই মন থেকে বলনি। তুমি বলতে পারো না, কারণ ...

রেশমী: কী কারণ?

সুস্মিত: কারণ, তুমি যে আমাকে কত ভালবাসো, আমি তা জানি।

রেশমী: না জানো না। কতটা ভালবাসি?

সুস্মিত: জানি না, যাও।

রেশমী: রাগ করছো কেন সোনা? তোমাকে রাগাচ্ছিলাম। তোমাকে ভালবাসতে পারলে যে কেউ ধন্য হবে।

সুস্মিত: আহা! তুমি এই কথা বলাতেই আমি খুব খুশী হয়েছি। আমার আর কিছু চাই না। আমি ধন্য।

রেশমী: খুশী হবার মত এমন কিছু বলিনি। তুমি এমন ভাবে বল যেন তুমি নগন্য একটা মানুষ। অথচ তোমার জন্য মানুষ তুচ্ছ ভাবতে পারে নিজেকে, তুমি কারও চোখে অসাধারণ হতে পারো, আর তোমাকে নিয়ে কারও অনেক বড় পাগলামি থাকতে পারে। তুমি এইটা অনুভব করতে পারো না কেন?

সুস্মিত: তুমি প্রেম-ভালোবাসা বলতে কী বোঝ?

রেশমী: (লাজুক হাসি হেসে) আমি ভালবাসা বলতে বুঝি- যেমন ধর, তোমার গা ঘেসে কেউ ঘুমাচ্ছে, তুমি তার নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছো, ইচ্ছে করলেই একটু ছুঁইয়ে দেখতে পারছো ... অবাক চোখে তোমার খুব নিজের একটা মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করছো। আর আমার নিজের একান্তভাবে যা মনে হয়, মানে আমার নিজের যা চাওয়া তা হল- কারও বুকের কাছে লুকিয়ে শান্তির একটা ঘুম, আর মাঝে মাঝে পাস ফিরতে গিয়ে তার গায়ে পা তুলে দেওয়া ... হা হা হা হা !
ব্যস, আর জানি না। আমার কল্পনার দৌড় এই অবধি। এর পরে কি হবে জানি না। এবার তুমি বল, ভালবাসা বলতে কি বোঝ?

সুস্মিত: আমি ভালোবাসা বলতে বুঝি, দুজনে দুজনায় হারিয়ে যাওয়া। দুজনের আলাদা অস্তিত্ব থাকবেনা। এক হয়ে যাবো।

রেশমী: (ফাজিল হাসি হেসে) এক হয়ে যাবে মানে? কি করে? ধুর! কী যে বল? তাহলে ডাকাতের মত আচরণ কে করবে? হা হা হা হা !

সুস্মিত: (লাজুক অথচ ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে) ডাকাতের মত আচরণ? হা হা !! সে তো আরও পরে। যখন তাদের মধ্যে একটা সুতোরও ব্যবধান থাকবে না, কাপড় তো দূরের কথা।

রেশমী: (নকল রাগ দেখিয়ে) তোমরা ছেলেরা খালি একটা জিনিসই জানো!

সুস্মিত: তাই? হা হা হা হা !

রেশমী: কিন্তু তোমার রোমান্টিকতায় আমি মুগ্ধ।

চোখে চোখ, হাতে হাত রেখে দুজনেই অনেক ক্ষণ মুখোমুখি চুপ চাপ বসে রইল। সম্বিত ফিরলো রেস্টুরেন্ট বয়ের আগমনে।

বয়: ইয়োর অর্ডার প্লিজ়।

... ... ...

আর তিন মাস পর সুস্মিত ও রেশমীর শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন হবে। আপনারা সবাই আশীর্বাদ করবেন যেন নবদম্পতি চিরসুখি হয়।।

Tuesday, 14 August 2007

ভারতের নবজাগরণ - পর্ব ২


৬০ বছর আগে আজকের দিনে মধ্যরাতে, ১০০০ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের মুক্তি ঘটে। অনেকে হয়তো ভ্রু কুঁচকে বলবেন - সে কী, ভারতীয় উপমহাদেশ তো মাত্র ২৫০ বছর ইংরেজদের অধীনে ছিল। তাহলে ১০০০ বছরের পরাধীনতার মানে কী?

আমি এইজন্যেই ১০০০ বছরের পরাধীনতা বলেছি কারণ, ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্টের পূর্বে, ভারতীয় উপমহাদেশ বিদেশী শাসকের দ্বারা শাসিত, শোষিত, উপকৃত, অপকৃত হয়ে এসেছিল। শাসকেরা কেউই স্থানীয়, দেশীয় বা উপমহাদেশীয় ছিল না। তাদের সভ্যতা ছিল বিদেশী, তাদের সংস্কৃতি ছিল বিদেশী। অনেকে হয়তো বলবেন - দেশী বা বিদেশী তো আপেক্ষিক। যুগ যুগ ধরে মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়েছে, বসতি স্থাপন করেছে আর সেই উপনিবেশকে নিজের করে নিয়েছে। কিন্তু তবুও বলি, প্রায় সাত থেকে পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে, তিলে তিলে একটি মিশ্র সভ্যতা গড়ে উঠেছিল দেশীয় অনার্য (অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়), তিব্বতি মোঙ্গলীয় ও আর্য (পূর্ব ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত) জাতির মিশ্রণে। পাঁচ হাজারেরও অধিক বছর একত্রে থাকার ফলে একটি সভ্যতা গড়ে ওঠে। এক জাতি এক প্রাণ হয়ে যায়। কিন্তু ১০০০ বছর পূর্বে তুরষ্ক (এশিয়া মাইনর) ও পশ্চিম এশিয়া এবং সর্বশেষে ইউরোপ থেকে যখন বিদেশী শত্রুরা এই অঞ্চলে আসে বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে, তখন এই অঞ্চলের স্থানীয় রাজাদের হাত থেকে শাসন ক্ষমতা আস্তে আস্তে চলে যায় বিদেশীদের হাতে। দেশীয় রাজাদের রাজত্বে আমরা সুখে ছিলাম কিনা, অত্যাচারিত হচ্ছিলাম কিনা, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন কারণ, যাই হোক না কেন, হচ্ছিলাম নিজেদের লোকেদের দ্বারা। বিদেশী ভূ-পর্যটকদের লেখা থেকে জানতে পারি যে অন্তত, আমরা খেয়ে-পড়ে বেঁচে ছিলাম। হয়তো সাধারণ লোকজন খুব আড়ম্বর জীবন যাপন করতো না, কিন্তু খেয়ে-পড়ে শান্তিতে ছিল। কিন্তু বিদেশীরা তো আমাদের খাইয়ে, পড়িয়ে, সুখে, শান্তিতে রাখবে বলে তো এদেশে আসেনি। তাদের, এই দেশের লোকেদের উপর মায়া, মমতা থাকার কথাও না। পরিণামে যা হবার তাই হল, আমাদের স্বাধীনতার সূর্য ক্রমে ক্রমে অস্তমিত হল। আমাদের নিয়তি আমাদের ১০০০ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করলো। আমরা হয়ে গেলাম গোলাম জাত। আমাদের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন ঘটল, আমাদের শিরদাড়া গেল নুব্জ হয়ে। সেই ট্র্যাডিশন আমরা এখনও বহন করে চলেছি। এখনও সাহেব দেখলে আমরা গদ-গদ হয়ে পড়ি। চাকর-নফর মানসিকতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে।

যাই হোক, আজকের দিনে ৬০ বছর আগে, আবার সাধারণ দেশীয় জনগণের হাতে ক্ষমতা আসে, স্বাধীনতা আসে দ্বিখন্ডিত হয়ে। রাতারাতি ভারতবর্ষ হয়ে যায় - ভারত আর পাকিস্তান। এক জাতি হয়ে যায় দ্বি-জাতি। হায় অদৃষ্ট!!! এই দ্বি-জাতিতত্ব যে কত ভুয়ো তার প্রমান আমরা পেয়েছি ১৯৫২ তে ১৯৭১-এ।

আমরা হয়ত এখনও আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা পাইনি, অনেক ত্রুটি আছে, বিচ্যূতি আছে, দূর্নীতি আছে। কিন্তু কোন দেশই বিচ্যূতিহীন নয়, তাকে দোষহীন আদর্শ বানাতে হয়। আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি, আমাদের আরও অনেক কিছু অর্জন করার আছে। আমাদের হাতে এখনও অনেক কাজ বাকি।


Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.


* Applicable for M.S. Windows XP

Blog Archive