ব্লগারের পরিচয়

My photo
কোলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, India

Monday, 13 August 2007

ভারতের নবজাগরণ - পর্ব ১, চন্দ্রায়ণ (চন্দ্রযান-১)

ভারতের ৬০ তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে, ভারতের গৌরবজনক কয়েকটি কৃতিত্ব ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছে আছে। এই পর্যায়ে ভারতের মহাকাশ গবেষণা ও আগামী চন্দ্রাভিযান সম্পর্কে কিছু তথ্য উপস্থাপন করলাম।


মিডিয়ার কল্যাণে এই মুহূর্তে মনে হয় কারোরই আর জানতে বাকি নেই যে আর কিছুদিনের মধ্যেই চাঁদে পৌঁছে যাবে আমাদের চন্দ্রযান-১ এবং এই ব্যাপারে যে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)'র সঙ্গে ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা)'র একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে সে খবরটাও অনেকেরই জানা। তবে, এক্ষেত্রে প্রথমেই চাঁদে পৌঁছে যাবে বলাটা মনে হয় একটু ভুল হ'ল - কারণ, সে অর্থে চন্দ্রযান চাঁদে গিয়ে পৌঁছবে না। মানে, সরাসরি গিয়ে চাঁদের মাটিতে নামবে না। তার বদলে চাঁদের ১০০ কিলোমিটার ওপর দিয়ে আবর্তন করবে আর সেই সঙ্গে চালাবে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা। যেমন, রিমোট সেন্সিং পদ্ধতির সাহায্যে দূর থেকেই চাঁদের বুকে খোঁজ চলবে নানান খনিজ পদার্থের। চাঁদের মেরু অঞ্চলে বরফের খোঁজ করা হবে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি হবে চাঁদের মানচিত্র। চাঁদের বিভিন্ন পদার্থ থেকে রঞ্জনরশ্মির বিকিরণ নিয়েও চলবে গবেষণা।

সেই কবে ১৯৬৯ সালে চাঁদের মাটিতে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রেখেছিলেন নীল আর্মস্ট্রং । তার আগেও তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিলে গোটা চল্লিশ মহাকাশযান পাঠিয়েছিল চাঁদে। আর, তার পরে তো আরও অজস্র মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে। বস্তুত, সেই ঠান্ডা যুদ্ধের গোটা সময়টা জুড়ে, বিশ্বশক্তির দুই মেরুর মধ্যে এই নিয়ে এক ধরণের রেষারেষির সৃষ্টি হয়েছিল। এই সব অভিযানে চাঁদ থেকে নিয়ে আসা মাটি, পাথর নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাও কিছু কম হয়নি। আর, সেসবের ফলে জানাও গেছে নানা নতুন তথ্য। পরবর্তী সময়ে এই উৎসাহে অবশ্য খানিকটা ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। যাই হোক, চাঁদের মাটিতে শেষবারের মতো মানুষের পা পড়েছিল ১৯৭২ সালে। সুতরাং, এ সবের আরো এত বছর পরে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আবার অতি পরিচিত সেই চাঁদে মনুষ্যবিহীন একটা মহাকাশযান পাঠানোর তাৎপর্য কী? এই জাতীয় একটা প্রশ্ন অনেকের মনেই আসতে পারে। তাই সবচেয়ে আগে দরকার এই ব্যাপারটা নিয়ে দু'একটা কথা বলা।

মানুষের প্রথমবার চাঁদে পা রাখার এত বছর পরেও আজও চাঁদ সম্পর্কে অনেক কিছুই আমাদের অজানা। সত্যি কথা বলতে কি, মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কাছে চাঁদ আজও একটা বিরাট রহস্য। প্রথমত, সৃষ্টির প্রসঙ্গ। চাঁদের সৃষ্টি ঠিক কিভাবে হয়েছিল সেই ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি। মনে করা হয়, আজ থেকে মোটামুটিভাবে ৪৫ বিলিয়ন বছর আগে, পৃথিবী যখন পুরোপুরি কঠিন অবস্থায় আসেনি, ঠিক সেই সময়ে বেশ বড় আকারের কোন মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষের ফলে পৃথিবীর বাইরের দিকের বেশ কিছুটা অংশ ছিটকে মহাকাশে চলে গিয়েছিল। এটিই পরবর্তী সময়ে কঠিন হয়ে জন্ম দিয়েছিল চাঁদের। এই তথ্যের সমর্থনে যুক্তিও আছে অনেক। যেমন, চাঁদের মাটি, পাথর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে পৃথিবীর বাইরের দিকের অংশের মতো তাতেও লোহার পরিমাণ কম। কিন্তু, এসবের পরেও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়।

আর একটা মজার ব্যাপার হ'ল, সাধারণভাবে সৌরমণ্ডলের আর সব গ্রহ আর তাদের উপগ্রহের মধ্যে আকৃতির যে অনুপাত সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়, পৃথিবী আর চাঁদের বেলায় সেটা বেশ একটু অন্য রকমের। অন্য গ্রহগুলির ক্ষেত্রে তাদের তুলনায় উপগ্রহগুলি বেশ ছোট মাপের। পৃথিবীর তুলনায় চাঁদ কিন্তু মোটেও অত ছোট নয়। কিভাবে এত বড় একটা চাঁদ আমাদের কপালে জুটলো, মতান্তর রয়েছে তা নিয়েও। তারপরে, চাঁদের দক্ষিণমেরু অঞ্চলের অ্যাইটকিন অঞ্চল নিয়েও বিজ্ঞানীমহলে কৌতূহল আর জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, সাম্প্রতিককালে চাঁদে পাঠানো হয়েছে একাধিক মহাকাশযান আর সেগুলি থেকে পাওয়া নানা রকম তথ্য জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্কের। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে চাঁদ নিয়ে নতুন করে গবেষণা ভীষণরকম জরুরি।

এখন প্রশ্ন হ'ল, আমাদের চন্দ্রযান-১ কিভাবে বা কতটা সেই প্রয়োজন মেটাতে পারবে বা এক কথায় কেমন হবে সেই গবেষণা ? এই প্রসঙ্গে বলা যায়, চন্দ্রযান একসঙ্গে অনেকগুলি বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান চালাবে যা এই প্রথমবারের জন্য হতে চলেছে। এই নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ করাই যায়, তবে, তা না করে বরং দু'একটির উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো একটু পরিষ্কার হতে পারে। যেমন, উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে চন্দ্রপৃষ্ঠের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হবে। রিমোট সেন্সিং বা দূর-সংবেদী আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সন্ধান চালানো হবে নানা রকম খনিজ পদার্থের। চাঁদের বিভিন্ন পদার্থ থেকে রঞ্জনরশ্মি নির্গত হয়। চন্দ্রযানের উন্নত যন্ত্রপাতি এইসব রঞ্জনরশ্মি বিশ্লেষণ করে চাঁদের বিভিন্ন পদার্থ সম্পর্কে নানা রকম তথ্য সংগ্রহ করবে। এইভাবে চাঁদের বুকে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি পদার্থের অস্তিত্বের ব্যাপারে অনেক কিছু জানতে পারা যাবে।

বিভিন্ন মহাকাশ অভিযান থেকে নিয়ে আসা চাঁদের মাটি, পাথর পরীক্ষা করে চাঁদে জলের অস্তিত্বের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন প্রমাণ এতদিন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ব্যাপারটা একটা অনুমানের পর্যায়েই ছিল। অবশ্য, তার একটা কারণও আছে। চাঁদের সূর্যালোকিত অংশ প্রচন্ড উত্তপ্ত, তাপমাত্রা ১৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মতো। অন্যদিকে, অন্ধকার অংশ আবার ততোধিক শীতল, তাপমাত্রা মাইনাস ১৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। স্বাভাবিকভাবেই তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা যে চাঁদের আলোকিত অংশ থেকে সমস্ত জলীয় পদার্থ বাষ্পীভূত হয়ে এই অন্ধকার অংশের শীতলতায় কঠিন হয়ে জমা হয়েছে। সম্প্রতি এই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে একটি ঘটনা। ১৯৯৮ সালে নাসা চাঁদে পাঠিয়েছিল লুনার প্রসপেক্টর। তার নিরীক্ষণে ইঙ্গিত মিলেছে চাঁদের মেরু অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেনের যৌগ রয়েছে যা বরফ হলেও হতে পারে। সুতরাং, চাঁদে জল থাকার ব্যাপারটা এখন আর ঠিক অতটা অনুমানের পর্যায়ে নেই। চন্দ্রযান আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে চাঁদের মেরু অঞ্চলে বরফের খোঁজ করবে এবং গবেষণা করবে বাষ্পীভূত পদার্থের চলাচলের বিষয়ে। সর্বোপরি, এইসব নানা গবেষণায় যে সব তথ্য পাওয়া যাবে সেগুলির সাহায্যে সৌরমণ্ডল তথা চাঁদের উত্পত্তি ও ক্রমবিবর্তনের ব্যাপারে নতুন করে আলোকপাত করা সম্ভব হবে।

এতসব করার জন্য, বলাই বাহুল্য, আধুনিক আর উন্নতমানের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হবে এবং এই একটি ক্ষেত্রেই আক্ষরিক অর্থে ব্যাপারটা আর শুধু এদেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অর্থাৎ, চন্দ্রযানে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি যন্ত্রপাতির পাশাপাশি থাকছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তৈরি নানা রকম যন্ত্রপাতি। যেমন, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় আর নাসা'র অনুদানপ্রাপ্ত জেট প্রপালশন গবেষণাগারের যুগ্ম উদ্যোগে তৈরি মুন মিনেরোলজি ম্যাপার। এই যন্ত্রটি চাঁদের বুকে বিভিন্ন খনিজ পদার্থের অস্তিত্বের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাবে। চাঁদের মেরু অঞ্চলে বরফের খোঁজ করবে মিনি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার বা সংক্ষেপে মিনি সার। এটিও একটি মার্কিন যন্ত্র যা তৈরি হয়েছে নাসার সাহায্যে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকছে জার্মানিতে তৈরি একটি নিয়ার ইনফ্রারেড স্পেকট্রোমিটার যা বিভিন্ন খনিজ পদার্থের অনুসন্ধান করবে। আরো থাকছে বুলগেরিয়ায় তৈরি রেডিয়েশন ডোজ মনিটর নামে বিকিরণ মাপার যন্ত্র। এছাড়াও থাকছে সুইডেনের অ্যাটম রিফ্লেক্টিং অ্যানালাইজার। এদের পাশাপাশি থাকছে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্র। যেমন, চাঁদের মানচিত্র তৈরি করার জন্য টেরিন ম্যাপিং ক্যামেরা, খনিজ পদার্থ সন্ধান করার জন্য হাইপার স্পেক্টরাল ইমেজার, এক্স-রে স্পেক্ট্রমিটার ইত্যাদি।

২০০৭-০৮ সাল নাগাদ এইসব লটবহর সমেত (সম্মিলিত ওজন যদিও খুব একটি বেশি হবে না) চন্দ্রযানকে পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেইকেল-এর সাহায্যে প্রথমে ডিম্বাকার কক্ষপথে স্থাপন করা হবে, ঠিক যেভাবে কিছুদিন আগে আবহাওয়া সংক্রান্ত খবরাখবর নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল একটি উপগ্রহকে। তারপরে ওইভাবেই দূরত্ব বাড়াতে থাকা হবে যতক্ষণ না তা চাঁদের মহাকর্ষের আওতায় গিয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে ২০০৭-০৮ সালে যে দারুণ একটা ব্যাপার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।


Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.


* Applicable for M.S. Windows XP

Wednesday, 8 August 2007

মাটির ময়না


গত ৩১ -এ জুলাই কলকাতার নন্দন প্রেক্ষাগৃহে 'মাটির ময়না' চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছে। ভারতে এই ছায়াছবিটির বাণিজ্যিক মুক্তিলাভের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪২ বছর পর দুই দেশে চলচ্চিত্র বিনিময়ের শুভ সূচনা ঘটল।
পাকিস্তানের উপনিবেশিকতার জের ধরে দীর্ঘদিন ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলচ্চিত্রের আদান-প্রদান বন্ধ ছিল। কিন্তু এর আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের চলচিত্র ভারতে প্রদর্শণের আইনগত কোনো বাধা নেই।
অজ্ঞতা ও রাজনৈতিক কারণেই এতদিন দুই দেশের মধ্যে ছবির আদান-প্রদান হয়নি। আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত 'মাটির ময়না'র কলকাতায় মুক্তি লাভের মধ্যদিয়ে দুই বাংলার মানুষ সাংস্কৃতিকভাবে আরো কাছাকাছি আসবে, সুস্থ ধারার ছায়াছবির জোয়ার সৃষ্টি হবে, আশা করা যায়।

আজ আমি ও আমার বন্ধু হাবিবুর নন্দন প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে 'মাটির ময়না' চলচ্চিত্রটি দেখে এলাম। বেশ ভাল লাগল। তবে আমরা সাধারণত আড়াই/তিন ঘন্টার ছায়াছবি দেখতে অভ্যস্ত তাই স্বল্প দৈর্ঘ্যের (মাত্র দেড় ঘন্টা) এই চলচ্চিত্রটি দেখে যেন মন ভরলো না।

বাংলাদেশে এই ছায়াছবিটি হয়ত অনেকেই দেখেছেন, তাই নতুন করে এর পটভূমিকা আর বললাম না। ছবিটি দেখে আমার মনে হল যে এর গল্পকার তথা নির্দেশক/পরিচালক, তারেক মাসুদ এই বার্তাটিই দিতে চেয়েছেন যে - আমরা বাঙ্গালিরা আত্মপরিচয়ের অভাবে (identity crisis) ভুগি। বুঝি না যে আমাদের প্রধান পরিচয় কী? আমরা আগে হিন্দু বা মুসলমান না আগে বাঙ্গালি। আমাদের সবার মনে রাখা দরকার যে আমরা আগে বাঙ্গালি। বাঙ্গালিত্ব হচ্ছে আমাদের আত্মপরিচয়। সোনার পাথরবাটি বলে কিছু হয় না। হয় সোনার বাটি কিম্বা পাথরের বাটি। সেইরকম হিন্দু সৌভ্রাতৃত্ব বা মুসলমান সৌভ্রাতৃত্বও কাল্পনিক বস্তু। বাঙ্গালি সৌভ্রাতৃত্বই হল আসল।

এই চলচ্চিত্রটি দেখে আমার একটাই কথা মনে হল - আর কত দিন? আর কত দিন আমরা পরস্পর ভেদাভেদ করবো? একে অপরকে ঘৃণা করবো? তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবো?


নন্দন ১ প্রেক্ষাগৃহে মাটির ময়নার বিজ্ঞাপন দেওয়াল চিত্র



নন্দন প্রেক্ষাগৃহের সামনে আমি (২)




নন্দন প্রেক্ষাগৃহের সামনে হবিবুর রহমান (আমার বন্ধু)




Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Tuesday, 31 July 2007

বিষণ্ণ গরাদ ছুঁয়ে আকাশের স্বপ্ন ছবি চোখে এঁকো


ভালো থেকো,
ভালো রেখো,
ভালো থাকা ও রাখা বড় ভালোকথা।
হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে
কাপাসতুলোর মতো
যাবতীয় ঘুণধরা ব্যথা।
ভালো থেকো,
ভালো রেখো,
ভালো থাকা ও রাখা বড় ভালোকথা।

ভালো আছো?
ভালো থাকা কাকে বলে জানো?
তুমি কি গহীন রাতে
মাদলের তীব্র ধ্বনি শুনেছো কখনো?
দেখেছো কখনো অহঙ্কারী যামিনী কালো
কিরকম তীব্র ক্ষোভে জ্বলে শশী অসংবৃত হয়ে
না কি তুমি সেইক্ষণে ভিন্ন ছাঁদে পড়েছিলে ঘুমিয়ে?

ভালো থেকো,
ভালো রেখো,
ভালো থাকতে ও রাখতে শেখো,
বিষণ্ণ গরাদ ছুঁয়ে
আকাশের স্বপ্ন ছবি চোখে এঁকো।।



Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Sunday, 29 July 2007

History of Bikrampur (East Bengal)

Bikrampur the political and cultural centre of ancient Bengal survives only in the name of an area in the Munshiganj district of Bangladesh. The remains of the city of Bikrampur, the capital of the ancient kingdoms of southeastern Bengal, are lost and its location can only be guessed on the basis of available data.

The name of Bikrampur survived in the name of a pargana in the Mughal period. It appears in Todarmal's settlement in the 16th century yielding revenue of Rs 83,376. By 1728 the revenue had increased to Rs 1,03,001, and to decrease again in 1763 to Rs 24,568, partly due to creation of two new parganas, Rajnagar and Baikunthapur, out of it and partly due to the destructive activity of the Padma. Today the name does not exist even officially; but the inhabitants of a vast tract of land in the Munshiganj district still feel pride in saying that they belong to Bikrampur, which, of course, emanates from the past glory of the area.

In the ancient period Bikrampur was undoubtedly the most important political centre in the Banga janapad. Indeed, it was the capital city of the Chandra, Barman, Sen, rulers, from the beginning of the 10th century AD to the beginning of the 13th century AD. Bikrampur appears for the first time in the copperplates of Shrichandra as sa khalu shrivikramapura samavasita shrimajjayaskandhavarat (from the royal camp of victory or capital situated at Bikrampur) and it held that position through the rule of the subsequent Varman and Sen dynasties.

Even during the rule of the Sens, who held sway over practically the whole of Bengal, Bikrampur continued to be their capital, and Laksmansen came to this place after his defeat at Nadia at the hands of the Muslim invader Bakhtiyar Khalji, where his two sons, Vishwarupsen and Keshabsen ruled for a short period. Though the copperplates of Vishwarupsen and Keshabsen do not mention Bikrampur as the capital, but the land granted by them lay in Bikrampur bhage, indicating their hold over the area. Bikrampur's eminence continued till the early 1280s, when Danujmadhab Dasharathdeb or Dhanuj Rai of Ziauddin Barani transferred his capital to nearby Subarnagram (Sonargaon). From then onwards, throughout the Sultanate period, it remained in oblivion, only to make a comeback as the name of a pargana in the Mughal revenue roll. The heroic resistance to Mughal aggression put up by Chand Rai and Kedar Rai, the zamindars of Bikramapur (two of the illustrious Baaro-bhuiyans of Bengal) added short-lived glory to Bikrampur.

Today Bikrampur is an extensive region of the Munshiganj district, and at some point of time it extended over some parts of Faridpur across the Padma. However, it must be said that it is difficult to ascertain the exact boundary of the territorial unit of that name. On the basis of the geophysical characteristics of the area an attempt can be made without any claim for exactitude. In the Thakbast Surveys map (1845-1877) there is no mention of the Kirtinasha (the Padma just before meeting the Meghna). Bikrampur comprised the area with the Padma on the west, the Dhaleshwari on the north and east, and the confluence of the Arial river and the Meghna on the south. A local poet Lala Ramgati in his Mayatimirchandrika mentions that Brahmin Pandits abound in the beautiful rajya named Bikrampur, which lies between the Brahmaputra mahatirtha on the east and the Padmabati on the west.

The small river Kaliganga (shown in James Rennel's map of 1781) flowed through the middle of the tract, and on its either bank grew the prosperous villages of Idrakpur (Munshiganj), Firingibazar, Abdullapur, Mirganj, Serajdi, Sekernagar, Hasara, Sholaghar, Baraikhali, Thaodiya, Baligaon, Rajabadi etc on the north and Mulfatganj, Karatikal, Japsa, Kandapada, Shyamsundar, Khilgaon, Sarenga, Chikandi, Ganganagar, Radhanagar, Rajnagar, Ghagariya, Larikul etc on the south. The Padma, however, played havoc in the area in the 17th century and by devouring the glorious deeds of Chand Ray and Kedar Ray earned the epithet of Kirtinasha, the destroyer of relics. The Kaliganga cut through the middle of the tract dividing it into two parts: Uttar Bikrampur and Dakshin Bikrampur. About 200 years ago Bikrampur was about 30 to 40 miles from east to west and about 8 to 10 miles from north to south.

The site of the city of Bikrampur has been identified with the Rampal area not far from the modern town of Munshiganj. It has been estimated on the basis of the archaeological exploration of the area that the ancient capital covered about 15 square miles, on which are situated some 17 or 18 villages. To the north is the Ichhamati river, and there still stand the remains of a very high parapet running east to west, parallel with the ancient course of the river. To the east is the ancient stream of the Brahmaputra. There are two wide moats, one on the west and one on the south, which in present times are known respectively as the Mirkadim canal and the Makuhati canal. The royal palace, known as the Ballaalbaadi, on high ground within the mud-fort citadel, with a 200 feet wide ditch around it, is now in ruins.

A large number of tanks, mostly dating from pre-Muslim period, can be seen around Rampal, but hardly any building of that period except the derelict ruins of temples; NK Bhattashali identified in 1929 the remains of as many as 30. Dhipur and Sonarang are the two important temple sites mentioned by him. RD Banerji also noticed structures in nearby Raghurampur. Bajrayogini, a nearby village, was the birthplace of famous Buddhist scholar Atish Dipankar Shreegnan. The whole area yielded highly valuable antiquities: sculptures of exquisite quality (both Hindu and Buddhist), objects of precious metals. A silver Bishnu image from this area (Churain) is now preserved in the Indian Museum. An eleventh century divine nymph (surasundari) hewn out of a long wooden pillar and forming a part of a column (now preserved in the Bangladesh National Museum) is considered to be a unique find in the whole sub-continent. Two other wooden pillars with sculptural decorations were found from the famous Rampal Dighi (2200 ft x 840 ft). Though the present landscape around Rampal would not give any indication of the existence of a metropolis in the distant past, the find of the antiquities and the legends around speak of the past glory of the ancient city. The river system around might have also contributed to the extinction of the once prosperous city. However, the medieval ruins of a mosque and tomb of Baba Adam Shahid at Rampal now stand as the only visible historical monuments in the area.

Whether the name of the village Rampal has any connection with the famous Pal king of that name is difficult to ascertain. It is known from epigraphical records that the Barman king BhojBarman or SamalBarman propitiated the friendship of the Pal king, Ramapal by offering him elephants and chariots. It may be that Rampal visited Bikrampur and the area near the palace where he was ceremoniously received was developed and named after him. It is unlikely that Rampal had Bikrampur area under his control. There is a local tradition that the area was named Rampal after a local merchant. Ramananda Pal, popularly called Rampal, was the grocer to the royal family during Ballalsen's rule, and he amassed wealth, settled down in the neighbourhood of the royal palace and came to be recognised as a respectable person. When Ballalsen dug his dighi, it stretched up to Ramapal's house. A local proverb goes like this: Ballal katay dighi name Rampal (the tank was excavated by Ballal, but it got the name of Rampal).


Bibliography Dilip K Chakrabarti, Ancient Bangladesh, Dhaka, 1992; Jogendranath Gupta, Bikrampurer Itihas (in Bangla), Kolkata, 1405 BS.

Friday, 8 June 2007

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি


আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।

তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন
অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন
পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা,
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।

আমি উচ্চারিত সত্যের মতো
স্বপ্নের কথা বলছি।
উনুনের আগুনে আলোকিত
একটি উজ্জ্বল জানালার কথা বলছি।
আমি আমার মা'য়ের কথা বলছি,
তিনি বলতেন প্রবহমান নদী
যে সাঁতার জানে না তাকেও ভাসিয়ে রাখে।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নদীতে ভাসতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মা'য়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি
গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।
ভালোবাসা দিলে মা মরে যায়
যুদ্ধ আসে ভালোবেসে
মা'য়ের ছেলেরা চলে যায়,
আমি আমার ভাইয়ের কথা বলছি।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্তানের জন্য মরতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সূর্যকে হৃদপিন্ডে ধরে রাখতে পারে না।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল
কারণ তিনি ক্রীতদাস ছিলেন।

আমরা কি তাঁর মতো কবিতার কথা বলতে পারবো?
আমরা কি তাঁর মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো?

তিনি মৃত্তিকার গভীরে
কর্ষণের কথা বলতেন
অবগাহিত ক্ষেত্রে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপনের কথা বলতেন
সবত্সা গাভীর মত
দুগ্ধবতী শস্যের পরিচর্যার কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

যে কর্ষণ করে তাঁর প্রতিটি স্বেদবিন্দু কবিতা
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
শস্যহীন প্রান্তর তাকে পরিহাস করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাতৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্ষুধার্ত থেকে যাবে।

যখন প্রবঞ্চক ভূস্বামীর প্রচন্ড দাবদাহ
আমাদের শস্যকে বিপর্যস্ত করলো
তখন আমরা শ্রাবণের মেঘের মত
যূথবদ্ধ হলাম।
বর্ষণের স্নিগ্ধ প্রলেপে
মৃত মৃত্তিকাকে সঞ্জীবিত করলাম।
বারিসিক্ত ভূমিতে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করলাম।
সুগঠিত স্বেদবিন্দুর মত
শস্যের সৌকর্য অবলোকন করলাম,
এবং এক অবিশ্বাস্য আঘ্রাণ
আনিঃশ্বাস গ্রহণ করলাম।
তখন বিষসর্প প্রভুগণ
অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করলো
এবং আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট তাম্রলিপির মত
রৌদ্রালোকে উদ্ভাসিত হলাম।
তখন আমরা সমবেত কন্ঠে
কবিতাকে ধারণ করলাম।
দিগন্ত বিদীর্ণ করা বজ্রের উদ্ভাসন কবিতা
রক্তজবার মত প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
পরভৃতের গ্লানি তাকে ভূলুন্ঠিত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
অভ্যুত্থানের জলোচ্ছ্বাস তাকে নতজানু করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
পলিমাটির সৌরভ তাকে পরিত্যাগ করবে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তিনি স্বপ্নের মত সত্য ভাষণের কথা বলতেন
সুপ্রাচীন সংগীতের আশ্চর্য ব্যাপ্তির কথা বলতেন
শস্যের নক্ষত্রের আলোকিত প্রান্তরের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

যখন কবিকে হত্যা করা হল
তখন আমরা নদী এবং সমুদ্রের মোহনার মত
সৌভ্রাত্রে সম্মিলিত হলাম।
প্রজ্জ্বলিত সূর্যের মত অগ্নিগর্ভ হলাম।
ক্ষিপ্রগতি বিদ্যুতের মত
ত্রিভূবন পরিভ্রমণ করলাম।
এবং হিংস্র ঘাতক নতজানু হয়ে
কবিতার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলো।
তখন আমরা দুঃখকে ক্রোধ
এবং ক্রোধকে আনন্দিত করলাম।

নদী এবং সমুদ্রে মোহনার মত
সম্মিলিত কন্ঠস্বর কবিতা
অবদমিত ক্রোধের আনন্দিত উত্সারণ কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে তরঙ্গের সৌহার্দ থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
নিঃসঙ্গ বিষাদ তাকে অভিশপ্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মূক ও বধির থেকে যাবে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল
আমি একগুচ্ছ রক্তজবার কথা বলছি।

আমি জলোচ্ছ্বাসের মত
অভ্যুত্থানের কথা বলছি
উৎক্ষিপ্ত নক্ষত্রের মত
কমলের চোখের কথা বলছি
প্রস্ফুটিত পুষ্পের মত
সহস্র ক্ষতের কথা বলছি
আমি নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননীর কথা বলছি
আমি বহ্নিমান মৃত্যু
এবং স্বাধীনতার কথা বলছি।

যেদিন রাজশক্তি আমাদের আঘাত করলো
তখন আমরা প্রাচীণ সংগীতের মত
ঋজু এবং সংহত হলাম।
পর্বত শৃংগের মত
মহাকাশকে স্পর্শ করলাম।
দিকচক্রবালের মত
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলাম;
এবং শ্বেত সন্ত্রাসকে
সমূলে উত্পাটিত করলাম।

তখন আমরা নক্ষত্রপুঞ্জের মত
উজ্জ্বল এবং প্রশান্ত হলাম।

উৎক্ষিপ্ত নক্ষত্রের প্রস্ফুটিত ক্ষতচিহ্ন কবিতা
স্পর্ধিত মধ্যাহ্নের আলোকিত উম্মোচন কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নীলিমাকে স্পর্শ করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মধ্যাহ্নের প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত হতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্ত্রাসকে প্রতিহত করতে পারে না।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি শ্রমজীবী মানুষের
উদ্বেল অভিযাত্রার কথা বলছি
আদিবাস অরণ্যের
অনার্য সংহতির কথা বলছি
শৃংখলিত বৃক্ষের
উর্দ্ধমুখী অহংকারের কথা বলছি,
আমি অতীত এবং সমকালের কথা বলছি।
শৃংখলিত বৃক্ষের উর্দ্ধমুখী অহংকার কবিতা
আদিবাস অরণ্যের অনার্য সংহতি কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
যূথভ্রষ্ট বিশৃংখলা তাকে বিপর্যস্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
বিভ্রান্ত অবক্ষয় তাকে দৃষ্টিহীন করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম হীনমন্য থেকে যাবে।

যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম
তখন চতুর্দিকে ক্ষুধা।
নিঃসঙ্গ মৃত্তিকা শস্যহীন
ফলবতী বৃক্ষরাজি নিস্ফল
এবং ভাসমান ভূখন্ডের মত
ছিন্নমূল মানুষেরা ক্ষুধার্ত।

যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম
তখন আদিগন্ত বিশৃংখলা।
নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননী শোকসন্তপ্ত
দীর্ঘদেহ পুত্রগণ বিভ্রান্ত
এবং রক্তবর্ণ কমলের মত
বিস্ফোরিত নেত্র দৃষ্টিহীন।
তখন আমরা পূর্বপুরুষকে
স্মরণ করলাম।
প্রপিতামহের বীর গাঁথা
স্মরণ করলাম।
আদিবাসী অরণ্য এবং নতজানু শ্বাপদের কথা
স্মরণ করলাম।

তখন আমরা পর্বতের মত অবিচল
এবং ধ্রুবনক্ষত্রের মত স্থির লক্ষ্য হলাম।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি স্থির লক্ষ্য মানুষের
সশস্ত্র অভ্যুত্থানের কথা বলছি
আমি শ্রেণীযুদ্ধের অলিন্দে
ইতিহাসের বিচরণের কথা বলছি
আমি ইতিহাস এবং স্বপ্নের কথা বলছি।

স্বপ্নের মত সত্যভাষণ ইতিহাস
ইতিহাসের আনন্দিত অভিজ্ঞান কবিতা
যে বিনিদ্র সে স্বপ্ন দেখতে পারে না
যে অসুখী সে কবিতা লিখতে পারে না।

যে উদ্গত অংকুরের মত আনন্দিত
সে কবি
যে সত্যের মত স্বপ্নভাষী
সে কবি
যখন মানুষ মানুষকে ভালবাসবে
তখন প্রত্যেকে কবি।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।

খন্ডযুদ্ধের বিপরীতে
আমরা ভূমি কর্ষণ করেছি।
হত্যা এবং ঘাতকের সংকীর্ণ ছায়াপথে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করেছি।
এবং প্রবহমান নদীর সুকুমার দাক্ষিণ্যে
শস্যের পরিচর্যা করেছি।

আমাদের মুখাবয়ব অসুন্দর
কারণ বিকৃতির প্রতি ঘৃণা
মানুষকে কুশ্রী করে দেয়।
আমাদের কণ্ঠস্বর রূঢ়
কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
কণ্ঠকে কর্কশ করে তোলে।
আমাদের পৃষ্ঠদেশে নাক্ষত্রিক ক্ষতচিহ্ন
কারণ উচ্চারিত শব্দ আশ্চর্য বিশ্বাসঘাতক
আমাদেরকে বারবার বধ্যভূমিতে উপনীত করেছে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমার সন্তানেরা
আমি তোমাদের বলছি।
যেদিন প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ
সূর্যের মত সত্য হবে
সেই ভবিষ্যতের কথা বলছি,
আমি ভবিষ্যতের কবিতার কথা বলছি।

আমি বিষসর্প প্রভুদের
চির প্রয়াণের কথা বলছি
দ্বন্দ্ব এবং বিরোধের
পরিসমাপ্তির কথা বলছি
সুতীব্র ঘৃণার
চূড়ান্ত অবসানের কথা বলছি।

আমি সুপুরুষ ভালবাসার
সুকণ্ঠ সংগীতের কথা বলছি।

যে কর্ষণ করে
শস্যের সম্ভার তাকে সমৃদ্ধ করবে।
যে মত্স্য লালন করে
প্রবহমান নদী তাকে পুরস্কৃত করবে।
যে গাভীর পরিচর্যা করে
জননীর আশীর্বাদ তাকে দীর্ঘায়ু করবে।
যে লৌহখন্ডকে প্রজ্জ্বলিত করে
ইস্পাতের তরবারি তাকে সশস্ত্র করবে।

দীর্ঘদেহ পুত্রগণ
আমি তোমাদের বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি
বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
ভাইয়ের যুদ্ধের কথা বলছি
আমি আমার ভালবাসার কথা বলছি।
আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি।

সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা
সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো?
আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো?


--- আবু জ়াফর ওবায়দুল্লাহ্‌


Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Sunday, 3 June 2007

বিশ্বকবি ও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন


১৯০৫ সাল। নানা কারণেই এই বছরটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এই বছরটিতেই তত্কালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন নবচেতনায় জেগে ওঠা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের শ্বাসরোধ করার লক্ষ্যে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করেন। তাঁর এই পরিকল্পনার কথা অবশ্য এর আগেই, মোটামুটি ১৯০৩-এর শেষ নাগাদই, জনসমক্ষে চলে এসেছিল। সে সময়ে কার্জন তত্কালীন অসমে চট্টগ্রাম ডিভিশন এবং ঢাকা ও ময়মনসিং জেলার অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দিলে সারা বাংলা জুড়েই বিক্ষোভের ঢেউ উত্তাল হয়। এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন রাজনৈতিক নেতারা, হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের জমিদাররা। ক্ষোভে ফেটে পড়েন বাংলার সাধারণ মানুষ। কার্জনের এই প্রস্তাবের বিরোধিতায় সমগ্র বাংলা জুড়ে বহু সভা ডাকা হয়। এই প্রস্তাবকে ধিক্কার জানিয়ে শুধুমাত্র পূর্ব বাংলায়ই তখন ৫০০টি বৈঠক ডাকা হয়েছিল। চুপ করে বসে থাকেনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও। ভাইসরয়কে তাঁর এই পরিকল্পনা বাতিল করার আহ্বান জানাতে ১৯০৩ ও ১৯০৪ সালে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পর পর দুটি অধিবেশনে যথাক্রমে মাদ্রাজ ও বম্বেতে প্রস্তাব গৃহীত হয়। বলা হয় তার এই প্রস্তাব বাঙালির চেতনায় আঘাত হানবে। কিন্তু সভাসমিতির মাধ্যমে এই ধরণের কিছু প্রতিবাদে কার্জনের দুরভিসন্ধির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।
১৯০৫ সালের ২০ জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়। ঐ বছরেরই ১৬ অক্টোবর (বাংলা মতে ১৩১২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ আশ্বিন) থেকে তা কার্যকর করার কথা বলা হয়। শ্রেণি বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার সকল মানুষই এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সরব হন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সামিল হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তিনি বলেন, আইনের সাহায্যে বাংলা ভাগ হতে চলেছে ৩০ আশ্বিন, কিন্তু ঈশ্বর বাংলার মানুষকে বিভক্ত করেননি। সেই কথা মাথায় রেখে এবং তা প্রকাশ্যে তুলে ধরতে ঐ দিনটি বাঙালির ঐক্যের দিন হিসেবে উদযাপিত করা হবে। তারই নিদর্শনস্বরূপ তারা একে অপরের হাতে বেঁধে দেবেন হলুদ সুতো। মুখে বলবেন- ভায়েদের মধ্যে বিভেদ করা যাবে না। দিনটিকে রাখি বন্ধনের দিন হিসেবে পালন করার ডাক দেন বিশ্বকবি। অপরদিকে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদিও অনশনের মাধ্যমে দিনটিকে শোকদিবস হিসেবে উদযাপনের প্রস্তাব দেন। দুটি প্রস্তাবই গৃহীত হয়।
এসবেরই অঙ্গ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ঐ দিন এক বিশাল মিছিল গঙ্গার উদ্দেশে রওনা হয়। মিছিলে অংশ নেন সমাজের বিশিষ্ট ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। ঐদিন সমস্ত দোকানপাট বন্ধ থাকে। রাস্তায় কোন যানবাহনও ছিল না। বাংলার স্বাভাবিক জীবন ছিল সেদিন অচল । গঙ্গায় ডুব দেওয়ার পর তারা একে অপরের হাতে রঙিন সুতো বেঁধে দেন। বাংলা তথা বাঙালির ঐক্য, বাঙালির সংস্কৃতি, তাদের আশা আকাঙক্ষা তুলে ধরে গান লিখলেন রবীন্দ্রনাথ। সেদিন সারাদিনই কলকাতা তথা সমগ্র বাংলা জুড়ে ঐ গানটি ধ্বনিত হতে থাকে-

'বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল-
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন বাংলার মাঠ-
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।।
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা-
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।।
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন-
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।।'

কলকাতার বিডন স্কোয়ারে ও বাংলার নানান জায়গায় রাখি বন্ধন উত্সবের আয়োজন করা হয়। ঐদিনই বিকেলে 'বঙ্গভবন' গড়ে তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পার্সিবাগানে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য নিয়ে আসা হয় আনন্দমোহন বসুকে। তিনি তখন খুবই অসুস্থ। ফেডরেশন হল-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।
প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের কন্ঠের প্রবল বন্দেমাতরম ধ্বনির মধ্যেই সভাপতির ভাষণটি পড়ে শোনান সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ঘোষণাটি পাঠ করা হয়| ইংরেজি বয়ানটি পাঠ করেন আশুতোষ চৌধুরি। বাংলা বয়ান পড়ে শোনান বিশ্বকবি। সভার পর সেই বিশাল জনমিছিল বাগবাজারে পশুপতি বসুর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। এই ঘটনার স্মরণে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার 'ঘরোয়া' বইটিতে লেখেন- সভার পর জনসাধারণ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। বিশাল মিছিলটি শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে অবশেষে বাগবাজারে পশুপতিবাবুর বাড়িতে পৌঁছয়।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ কবিগুরুরই লেখা একটি গান গাইতে থাকেন। তারই কিছু অংশ-

'চিরদিন টানবে পিছে, চিরদিন রাখবে নীচে-
এত বল নাই রে তোমার, সবে না সেই টান।।
* * *
আমাদের শক্তি মেরে তোরাও বাঁচবি নে রে,
বোঝা তোর ভারী হলেই ডুববে তরীখান।।'


এর মধ্যে দিয়েই ব্রিটিশের একগুঁয়েমিকে ধিক্কার জানান বিশ্বকবি। সারা বাংলা সে সময় গুঞ্জরিত হতে থাকে এই সব গানে। কোন কোন গানে উঠে আসে রাজনৈতিক অধিকার কায়েমের ব্যর্থ বা লজ্জাজনক প্রচেষ্টা, কোথাও বা নদী ঘেরা ছায়া সুশীতল বাংলার গৌরবের কথা, শস্যশ্যামলা বাংলার ধানক্ষেতের কথা, তার তরুচ্ছায়াবৃত গ্রামগুলির কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করলেন তার সেই বিখ্যাত গান-

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস,আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।।
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে -
ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।।
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ কী মায়া গো-
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে ।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মত,-
মরি হায়, হায় রে -
মা তোর বদনখানি মলিন হলে; ও মা আমি নয়ন জলে ভাসি।।

এই গানটিই এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। ঐ বছর দুর্গাপূজার শেষ দিনে বিজয়া দশমী (২১ কার্তিক) উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ বলেন, বন্ধুগণ, এই বিজয়ার দিনে আমাদের হৃদয় ঘুরে বেড়াক সমগ্র বাংলা জুড়ে। আমাদের হৃদয় বিস্তারিত হোক উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণের উত্তাল তরঙ্গ বিধৌত সমুদ্র সৈকতে, পুবে দেশের নদীবেষ্টিত সীমানা থেকে পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চলে।... আমাদের হাত জোড় করা থাক, মাথা থাক নত। সর্বশক্তিমানের কাছে আমরা প্রার্থনা জানাই যে বাংলার মাটি ও জল, বায়ু ও ফল পবিত্র হোক।
সরকারিভাবে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ আগেই ১৯০৫-এর ১৩ জুলাই কৃষ্ণকুমার মিত্র তাঁর সাপ্তাহিক 'সঞ্জীবনী'তে বিদেশি পণ্য বর্জন করে কেবলমাত্র স্বদেশি জিনিস ব্যবহারের ডাক দেন। তার এই প্রস্তাব মেনে নেন সুরেন্দ্রনাথের মতো বিশিষ্ট নেতারা। রবীন্দ্রনাথও এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। তাঁর একটি গানে তিনি লেখেন- অলঙ্কার ভেবে ফাঁসির দড়ি কিনব না। 'অবস্থা ও ব্যবস্থা' শীর্ষক একটি রচনাও লেখেন তিনি। সেটি কলকাতার টাউন হল-এ আয়োজিত একটি জনসভায় ১৯০৫-এর ৭ আগস্ট পড়া হয়। দেশের কর্মক্ষমতা কাজে লাগাতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথা বলেন তিনি। এই কমিটির প্রধান হবেন একজন হিন্দু ও একজন মুসলমান। সকলকেই তাদের সব কথা মেনে চলতে হবে, সব আদেশ পালন করতে হবে, তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। তাদের সম্মান জানানোর মাধ্যমেই দেশকে সম্মান জানানো হবে।
বয়কটের ধারণার প্রবক্তা রবীন্দ্রনাথ নন। কিন্তু সরকারি প্রশাসন বয়কট করা, সমস্ত ধরণের সরকারি কাজকর্ম থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যবস্থাপনার চিত্রটি দেশবাসীর সামনে তিনিই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন বা স্বদেশি আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা যে শুধু চরম উত্সাহব্যঞ্জক ও উদ্দীপনামূলক গান, প্রবন্ধ ও কবিতাই পেয়েছি তা তো নয়, ভারতের ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরার তাত্পর্য ফুটে উঠেছে তাঁর লেখনীতে। গ্রামীণ পুনর্গঠন, সমবায় আন্দোলন, ভাষা সমস্যা ও সাহিত্যের নানান গুরুত্বপূর্ণ লেখা আমরা পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে। এই সময়ই দেশে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়েও নতুন ধারণা আনেন তিনিই। আসলে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদানের বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যতীত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের যথার্থ বিশ্লেষণ কখনোই সম্ভব নয়।



Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Thursday, 19 April 2007

গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রশ্নে ভারতীয়-উপমহাদেশে আশঙ্কা বাড়ছে

মারাত্মক সেই স্লো-পয়জন৷ গ্লোবাল ওয়ার্মিং। তাকে নিয়ে রাষ্ট্রপু্ঞ্জের ইন্টার গভর্ণমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) ফেব্রুয়ারিতে প্যারিসে তাদের প্রথম রিপোর্টে বলেছিল, মানুষই কালপ্রিট। তাই সতর্ক না হলে মাত্র ৫০ বছরে ডুবে যেতে পারে সুন্দরবন। সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে জলস্তর কুল ছাপিয়ে ভাসাতে পারে ভারত-বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলকেও। আর শুক্রবার ব্রাসেলসে আই পি সি -র দ্বিতীয় রিপোর্টে সতর্ক করা হচ্ছে হিমালয়কে নিয়ে। বলা হচ্ছে, ৫০ নয়, ৩০ বছরেই হিমালয়ের যাবতীয় হিমবাহের পাঁচ ভাগের চার ভাগই গরমের ঠেলায় গলে যাবে। ৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বরফের চাদর গুটিয়ে ১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার হয়ে যাবে। শুকিয়ে যাবে গঙ্গা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র। ভয় বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিয়েও। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশিরা আশ্রয় নেবে ভারতে। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

মজার কথা হচ্ছে, ভারত নিজের দোষে এই সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। বরং আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, চিনের কুকর্মের খেসারত দিতে হচ্ছে। তারা কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইড কিংবা সালফার-ডাই-অক্সাইডের মত গ্রিন হাউস গ্যাস প্রকৃতিতে উগরে দেয় ভারতের থেকে অনেক বেশি। পরিসংখ্যান বলছে - এক জন মার্কিন নাগরিক বছরে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবেশে ছড়ায়, ১৭ জন ভারতীয় উপমহাদেশের নাগরিক সমপরিমাণ দূষণের জন্য দায়ী। পৃথিবীর সব দেশের মধ্যে আমেরিকা সব থেকে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস উত্পাদন করে। কালো তালিকায় এর পরেই চিন৷ কিন্তু তাতে কি? জোর যার, মুলুক তার।

ভারতের উপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। অথচ কালো তালিকার শীর্ষে থাকা আমেরিকা, চিন বা অস্ট্রেলিয়া এই সঙ্কটেও মাথা নোয়াতে নারাজ। তারা ফেব্রুয়ারির রিপোর্টকে গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে শুধু জানিয়েছে, এখনই কিয়োটো প্রোটোকলে সই করতে রাজি নয় তারা। অজুহাত? দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হবে।

তবে যে যাই করুক, আগামী ৫০ বছরে যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.১ থেকে ৬.৪ ডিগ্রি সেল্সিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, তা নিয়ে আই পি সি সি-র দু-হাজার সদস্য বিজ্ঞানীর সন্দেহ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পৃথিবীর সব দেশ যদি সমঝোতায় এসে, একত্রিত ভাবে ১০ - ১৫ বছর গ্রিন হাউস গ্যাস উদ্গীরণ বন্ধ করতে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেয়, তা হলে এই শতকের শেষ দিকে তাপমাত্রার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। রক্ষা পেতে পারে ধরিত্রী।

কবে হবে সে সব ব্যবস্থা? জানা নেই। ফলে, তত দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের এনভায়রণমেন্ট প্রোগ্রামের প্রধানের হুঁশিয়ারিটাই, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ক্ষেত্রে ক্যাচলাইন হয়ে থাকবে - " সতর্ক হওয়ার শেষ বিন্দুটাও আমরা পেরিয়ে এসেছি"।



Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Tuesday, 17 April 2007

ফিরে দেখা

১৯৪৭, ১৪ই অগস্ট, রাত বারোটা, পূর্ব বঙ্গ হয়ে গেল পূর্ব পাকিস্তান

প্রতি দিন হু হু করে বাড়তে লাগল বঙ্গের পশ্চিম পারের জনসংখ্যা। নতুন পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে মানুষ চলে আসতে লাগলেন 'দেশান্তরে'। লক্ষ করার বিষয়, পশ্চিম ও পূর্ব, দুই পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তুরা কিন্তু একভাবে এলেন না। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যাঁরা এলেন, এলেন মোটামুটি একসময়েই। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ কিন্তু আসতে লাগলেন ঢেউয়ে ঢেউয়ে, বছরে বছরে। '৪০ - '৫০-এর দশক ছাড়িয়ে '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরেও, এমনকি আজও সঙ্গোপনে নিয়ত বহমান সেই শরণার্থী-ধারা।
সে সময়ই, ১৯৪৮-এ, University Institute Hall-এ এক ভাষণে পশ্চিমবঙ্গবাসীর উদ্দেশ্যে ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার উচ্চারণ করেছিলেন এই মোক্ষম সাবধানবাণী:"I warn West Bengal - do not spurn away such a rich racial element when seeking shelter at your doors. They alone can make you great if you utilise these human materials." এ দিকের সাবেক বাসিন্দাদের মনে তখন মিশ্র অনুভূত। 'ওদের' জন্য সহমর্মিতা, আর নিজেদের জন্য ভবিষ্যতের ভয়। কিন্তু বিপন্নতার তাড়নায় যেন এই শরণার্থী-বেশে-আসা প্রতিশ্রুতিময় মানবসম্পদকে পশ্চিমবঙ্গ কৃপার চোখে না দেখে, দূরে ঠেলে না দেয়: এই কথাটিই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যদুনাথ।
না, পশ্চিমবঙ্গ দূরে ঠেলে দেয়নি। ধৈর্য ও সমব্যথার সঙ্গে এই শরণার্থী স্রোতকে জায়গা করে দিয়েছিল। কাজটা ছিল কঠিন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নামমাত্র সাহায্যের বেশি কিছু করেনি। পুরো দায়টাই বহন করেছিল সদ্যোজাত, সদ্যোবিভক্ত, অনভিজ্ঞ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। কেন্দ্রের ব্যবহারে আঞ্চলিক বৈষম্যও ছিল বৈকি। পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের জন্য ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের যে অর্থ ব্যয়িত হয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীর জন্য তার এক দশমাংশও হল না। তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের ভাষায়, পশ্চিমবঙ্গে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য কেন্দ্রের খরচ - 'মাথাপিছু দুই বছরে কুড়ি টাকার বেশি নয়।'
প্রসঙ্গত, এমনিতেও বিরাট অর্থনৈতিক সংকটে ছিল সে দিনের পশ্চিমবঙ্গ। পাট ছিল প্রধান কৃষিজাত পণ্য। দেশভাগের সঙ্গে পাট-উত্পাদক অঞলগুলি বেরিয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গের নাগাল থেকে, পড়ে রইল কেবল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, ধুঁকতে থাকা কলকারখানা।
এই সামগ্রিক চাপের মধ্যেও উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের বিপুল দায় যে সে দিনের রাজ্য প্রশাসন পালন করতে পেরেছিল, কেননা এতে বড় একটা ভূমিকা নিল - সমাজ। কত মানুষ যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগিয়ে এলেন সাহায্য করতে। প্রায় একটা সামাজিক আন্দোলন বলা চলে। যে আন্দোলনের ইতিহাস কখনও লেখা হয়নি, হয়তো হবেও না। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নানারকম বাঙ্গালি মিলেমিশে যে একটা নতুন সমাজ তৈরি করে তুলল, তাকে প্রতি দিন সাংস্কৃতিক ভাবে সম্পন্ন করে চলল ঘটি-বাঙাল, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল, চিংড়ি-ইলিশ বিতর্ক; বেকার সমস্যা বৃদ্ধি; পাড়ার রকের আড্ডার ক্রমবিকাশ; বামপন্থি সাহিত্য সংস্কৃতি কৃষ্টি।
ঐতিহাসিক ভাবে, আর দুটি বড় ঘটনা ঘটল ক্রমে। ভারতের communist party পশ্চিমবঙ্গে যে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠল, তার পিছনে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল এই উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, উদ্বাস্তু colony-এর মানবিকীকরণের কাজ। সবচেয়ে বড় communist সমর্থক বাহিনী তৈরি হয়ে উঠতে লাগল এই নতুন আশ্রিত জনগোষ্ঠির মধ্যে থেকে।
দ্বিতীয়ত, উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে গেল মেয়েদের জীবনে ৷ তীব্র অনটন, আর্থিক দুর্দশা এবং পারিবারিক চাপের মুখে বড় দ্রুত ভেঙ্গে গেল অন্তঃপুরের অবরোধ। বাঙ্গালি মেয়েরা আগেও চাকরি করত, সমাজসেবায় যোগ দিত, কিন্তু সে ছিল হাতে গোনা। ১৯৪৭-এর পর, পরিবারের সব ক'জন সদস্যের কাজের খোঁজে না বেরিয়ে আর উপায় থাকল না। বাঙ্গালি মেয়েদের কাছে নারীশিক্ষা তখন আর পোশাকি বিলাশ নয়, পরিবারকে দাঁড় করানোর একান্ত মলিন বাস্তবে বেরিয়ে পড়ার সিঁড়ি।
পাওয়া, হারানো, এবং নতুন অর্জন: ১৯৪৭, পশ্চিমবঙ্গের জন্য রেখে গেল আলাদা তিনটি উত্তরাধিকার।


Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Blog Archive