ব্লগারের পরিচয়

My photo
কোলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, India

Friday, 12 September 2008

বিক্ষিপ্ত

সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা.. জোছনার আলোয় তোমাকে রহস্যময়ি লাগছিল.. শহুরে জীবনে লোডশেডিং না হলে নাকি জোছনাকে উপলব্ধি করা যায়না.. মেঘলা রাতের মায়াবী আধো আলো-ছায়াতে আমি তোমাকে কল্পনা করে নিয়েছিলাম.. আমার উচ্ছাসে তুমি প্রথমে খুব হাসলে.. তারপর যেন কোনো বিসন্নতার কালো চাদরের প্রতিফলন পড়লো তোমার উপর.. আমি চেয়েছিলাম সেই রাহুর গ্রাস থেকে তোমাকে মুক্ত করতে.. কপট রাগ, মিথ্যা হিংসুটে ভাব দেখিয়ে চেয়েছিলাম তোমাকে গ্রহণমুক্ত করতে.. কিন্তু তুমি কি চেয়েছিলে রাহুমুক্ত হতে? চাওনি, তবুও কিছুদিন সহযোগিতা করলে, নিজের অজান্তেই হয়তো আমাকে আপন করে নিলে বা হয়তো কোনোদিন আপন মনে করোইনি, হয়তোবা সবই ছিল তোমার ছলনা.. বুঝিনি রোগটা ছিল ছোঁয়াচে, যে রোগ থেকে তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছি, শেষ পর্যন্ত তাতেই আমি আজ রোগাক্রান্ত..

Friday, 5 September 2008

আমার সব শিল্পের মৃত্যু হোক এইখানে

যদি আমি তোমার কষ্টে ব্যথা না পাই
তোমার হতাশাকে উপলব্ধি করতে না পারি
যদি মানুষের হাহাকার, গণহত্যায় জেগে না উঠি,
আমার সব শিল্পের মৃত্যু হোক এইখানে

তোমার বুকের আগুন আর সৃষ্টির ছোঁয়ায়
আমার কবিতা থেকে যদি বৃষ্টি না ঝড়ে পড়ে
সব জেনেও তোমায় ভালোবাসতে না পারি
আমার সব শিল্পের মৃত্যু হোক এইখানে

যদি তোমার খোলা হাসিতে আমার অন্তর জেগে না ওঠে
যদি রাতের তমসাচ্ছন্ন ভোরের আলোর স্নিগ্ধতা মেখে
আমি তোমার ছবি আঁকতে না পারি
আমার সব শিল্পের মৃত্যু হোক এইখানে

কিসের জন্য আমার এ জীবন?
যদি আকাশের বিশালতার কাছে মাথা নত না করি
নিজেকে বারবার ভাঙতে না পারি, শুধুই থাকি অভিমানে
আমার সব শিল্পের মৃত্যু হোক এইখানে

Tuesday, 26 August 2008

স্মৃতি

স্বপ্নগুলো মোর ঢেকেছে বিষাদে
স্মৃতিগুলো তাই আজ নিরবে কাঁদে
কেন পারিনা তোমাকে ভুলে যেতে
পিছু ডাকে স্মৃতি প্রতি রাতে
কেন চোখে জল আসে
কেন মনে পড়ে তোমাকে

জীবনের নাম যদি রাখা হয় ভুল
স্মৃতির নাম তবে বেদনার ফুল
যা কিছু পেয়েছি আমি তা আমার নয়
চিঠি যেন এসে গেছে ভুল ঠিকানায়
খুঁজে পাওয়া যাবে না তো হারালো যে কূল
ভুল সবই ভুল

পাবে না তো খুঁজে কেউ আমার খবর
মনের অনেক নিচে দিয়েছি কবর
যদি কেউ আসে তবে বোলো আমি নেই
চোখে জল আসবে মনে পড়লেই
ফুটেছে আমার বুকে ব্যথার বকুল
ভুল সবই ভুল

Saturday, 12 July 2008

অস্তরাগ


শেষ অস্তরাগের নিঃশব্দ মায়াবী আলোয়
তোমার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়
তবুও অবুঝ আমি জানিনা কোন মোহে
কেন আমার সময় কাটে তোমার প্রতীক্ষায়?

Monday, 7 July 2008

আমি আর আমার একাকীত্ব

আমি আর আমার একাকীত্ব
প্রায়শঃই এই কথা বলাবলি করি-

তুমি থাকতে তো কেমন হতো
তুমি এটা বলতে, তুমি ওটা বলতে
তুমি এই কথায় অবাক হতে
ঐ কথায় কতটা হাসতে
তুমি থাকতে তো এমন হতো
তুমি থাকতে তো অমন হতো

আমি আর আমার একাকীত্ব
প্রায়শঃই এই কথা বলাবলি করি

এটা কি রাত নাকি তোমার খোলা, এলো চুল
জোছনা নাকি তোমার চাহনিতে স্নাত আমার রজনি
একি চাঁদ নাকি তোমার হাতের চুড়ি
তারা নাকি তোমার শাড়ীর আঁচল
দমকা বাতাস নাকি তোমার দেহের সুগন্ধ
পাতা ঝরার শব্দ নাকি তুমি চুপিচুপি কিছু বললে
আমি ভাবতে থাকি আনমনে জড়সড় চুপচাপ
যদিও আমি জানি -
তুমি নেই, কোথাও নেই!
কিন্তু মন বলে তুমি আছো
এইখানেই কোথাও আছো

দায়বদ্ধতা আমারও আছে, তোমারও
নিস্তব্ধ, বিনিদ্র রজনি আমিও কাটাই, তুমিও
অশ্রু জলে বালিশের কোনা ভেজে এখানেও, ওখানেও
বলার তো অনেক কিছুই আছে, কিন্তু কাকেই বা বলি আমি
কত দিন চুপ থাকবো, আর কত কাল আমি সইব
মন বলে- পৃথিবীর যত নিয়ম-কানুন আছে, উঠিয়ে দিই
প্রাচীর যা তোমার-আমার মধ্যে বাধা হয়ে আছে, ভেঙ্গে ফেলি
কেন আমার হৃদয় জ্বলছে সবাইকে জানিয়ে দিই-
হ্যাঁ, আমি ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি
...

Sunday, 8 June 2008

শিরোনামহীন কবিতা


কাঠ জ্বলে কয়লা হয়ে যায়
কয়লা পুড়ে হয়ে যায় ছাই
হৃদয় জ্বলেপুড়ে হয়না কিছুই
না ধোঁয়া না পড়ে রয় ছাই

কথা দিয়েছিলে যা সবই মনভোলানো
মন ভুলিয়েছিলে যা'বলে তা সব সাজানো
জানিনা সারবে কবে সে চোট পুরানো
কবে ফিরে পাবো সে মন হারানো

বরফ গলে জল হয়ে বয়ে যায়
মেঘ হয়ে তা আকাশে ভেসে বেড়ায়
তীর হৃদয়ে এমনই বিঁধে রয়
না গলে যায়রে না উড়ে যায়

Tuesday, 13 May 2008

অভিমান

আমি আজও রেখেছি তোমাকে দেয়া- না বলা প্রতিশ্রুতি
দূর থেকে নিরবে আজও ভালবাসি- চাইনি কখনও ক্ষতি
আঘাত দিয়েছি, আঘাত পেয়েছি- পারিনি করতে ঘৃণা
থেকো ভালো এই ছিল- সদা মোর কামনা
দূরে সরে গিয়ে করেছি পুরণ- তোমার মনোবাসনা
জানি একদিন বুঝবে তুমি- আমার ছিলনা কোনো ভান
হয়তো সেদিন রবোনা আমি- রবে শুধু নিরব অভিমান

Sunday, 23 March 2008

বন্ধু তুমিও?

তোমার সেতারে যে তার বেঁধেছিলাম আমি,
চাওনি তুমি শুনুক কেউ সে সুরের ঝংকারখানি,
পেয়েছো ভয় হবে বোধহয় বদনাম ও পারিবারিক মানহানি।

মুখ ফুটে বলতে একবার শুধু তুমি পাওনা কাউকে ভয়,
আমি যে শুধু তোমারি, তুমি ছাড়া এ জীবনে আর কেউ আমার নয়,
লড়তাম আমি সবার সাথে করতাম বিশ্বজয়।

চেয়েছিলাম মিত্র হতে কিন্তু আমার ভাগ্যের একি পরিহাস হায়,
সেই ভুলে ভরা গল্প- কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়,
অসফল হয়েছি আমি বার বার কিন্তু শুধুই কি নিজের ইচ্ছায়?

Wednesday, 19 March 2008

একটি অতৃপ্ত আত্মার জবানবন্দি

মাঝ রাতে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। সারা শরীর ছটফট করছে, হৃদ্‌স্পন্দন প্রচণ্ড তীব্র। না পারছি শুতে, না পারছি বসতে। ঘাড় এবং মাথায় চাপ ধরা ব্যথা। চোয়ালটা যেন কেমন শক্ত হয়ে আসছে। শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। এই চরম অস্বস্তিতে আর থাকতে পারছিনা। মনটাকে প্রচণ্ড একটা মৃত্যুভয় গ্রাস করে নিচ্ছে। আর বিছানায় থাকতে পারলাম না। অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে কোনোরকমে মশারি সরিয়ে খাট থেকে নেমে এলাম। টালমাটাল পায়ে অন্ধকারের মধ্যে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে খাবার ঘর এবং বসার ঘর পেরিয়ে যেতে চাইছিলাম মা বাবার ঘরে। মা-কে ডেকে বলতে চাইছিলাম - "মা, আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে ..."। কিন্তু নাহ্‌, যেতে পারলাম না। দরজার কাছে এসে পড়ে গেলাম। অর্ধেক শরীর আমার ঘরে, বাকী অর্ধেক খাবার ঘরে। অনেকক্ষণ কোনো হুশ নেই।
এইভাবে কতক্ষণ যে পড়ে আছি, জানিনা। হঠাৎ খুব শীতের অনুভুতি হতে লাগল। তারপর একসময় আর কোনো অনুভুতি নেই। তারপর উঠে দাড়ালাম। মেঝেতে কালচে মত চটচটে কী যেন একটা তরল পড়ে ছড়িয়ে আছে? চটচটে তরলটা এড়িয়ে কিছুটা সরে আসলাম। ভাল করে দেখবার চেষ্টা করলাম। দরজার কাছে কে যেন পড়ে রয়েছে? কেমন চেনা চেনা লাগছে! হ্যাঁ, একে তো আমি চিনি। কতবার আয়নায় দেখেছি এর প্রতিচ্ছবি। এ তো আমি। কী আশ্চর্য! নিজেকে নিজে দেখছি কি করে? সামনে কোন আয়না তো নেই। আমি এমনভাবে মেঝেতে শুয়ে রয়েছি কেন? নাক দিয়ে মুখ দিয়ে কালচে লাল মত তরলটা গড়িয়ে মেঝে ভেসে যাচ্ছে।
এবার সম্বিত ফিরলো। বুঝতে পারলাম- আমি আর নেই। মানে, আমার দেহের মৃত্যু হয়েছে। এখন আমি হলাম শুধুই এক অতৃপ্ত আত্মা।
সব কিছু কেমন অদ্ভুত লাগছে। নিজের মৃত্যুতে, চরম অতৃপ্তিতে নিজেরই কাঁদতে ইচ্ছে করছে। বাবা মা'র ঘরে যেয়ে দেখি ওরা ঘুমাচ্ছে। এই তো সবে তিন ঘন্টা আগে ওরা শুতে গেল। ওদের ডাকতে গিয়েও আর ডাকতে পারলাম না। থাক না আরেকটু ঘুমিয়ে, খুব মায়া হল। প্রথম সন্তানের মৃত্যু শোক ওরা কিভাবে সইবে? শেষবারের মত মা'র পাশে শুতে ইচ্ছে করল। মা'কে জড়িয়ে ধরে ডাকতে ইচ্ছে করল - "মাআআআ"।
এত কাছে মা'কে কোনো দিনও পাইনি। বেঁচে থাকতে, ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, মা অফিসে যাবার জন্য তৈরি। ইস্কুল থেকে এসে বিকালে, ঢেকে রেখে দেওয়া খাবার নিজে হাতে বেড়ে নিয়ে খেয়ে, মা'র ছেড়ে যাওয়া শাড়ীটাকে পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঐ শাড়ীটাতে একটা অদ্ভুত সুন্দর মা মা গন্ধ থাকতো।
পাশ ফিরে বাবার দিকে তাকালাম। দুঃখে গলা বন্ধ হয়ে গেল। বাবাকে জড়িয়ে কেঁদে বললাম - "বাবা, আমি তোমার কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। আমি সত্যই Good for nothing."
একী! কেউ কিছু টের পাচ্ছে না কেন? ওওও! টের পাবে কী করে? আমি তো শুধুই এক অতৃপ্ত আত্মা।
ভোর হয়ে গেছে, পাখীরা ডাকতে শুরু করেছে, চারিদিক আস্তে আস্তে আলোকিত হয়ে উঠছে। এর পরে সব ঘটনা দ্রুত ঘটতে লাগলো। মা'র ঘুম ভাঙ্গলো। অভ্যেস বসতঃ, চা করতে যাবার আগে মা একবার আমার ঘর থেকে ঘুরে আমাকে দেখে যায়। আজকেও দেখতে এসে ঘুম চোখে দরজার কাছে হোঁচট খেল। নিচে তাকিয়ে দেখে আমি পড়ে আছি। চিৎকার করে উঠে মা, বোন আর বাবাকে ডাকলো। ওরা তিনজনে কোনোরকমে আমার শরীরটাকে ধরে খাটে শুয়ে ডাকতার ডাকলো।
ডাকতার এসে পরীক্ষা করে আমার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিল। একে একে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধবেরা এল। পাড়া-প্রতিবেশীরা এল। হা হা!! এইবার বেশ মজাই লাগছে।
সারা ঘরে ফুল, মালা, ধুপ ও সুগন্ধির গন্ধে ম ম করছে। আর কিছুক্ষণ পরেই আমার শরীরটাকে নিয়ে যাওয়া হবে শ্মশানে। শেষবারের মত নিজেকে দেখছি। কয়েকটা মাছি নাকের কাছে, মুখের কাছে, কানের কাছে বসছে আবার উড়ে যাচ্ছে।
এই তো জীবন! আর কিছুক্ষণ পরে সাধের এই দেহটা দুমুঠো সাদা ছাই হয়ে যাবে।

Sunday, 6 January 2008

চঞ্চলা হরিণী

তুমি চঞ্চলা হরিণী, মনমরা তরুণী
হয়তো বা কোন নিষ্প্রাণ আত্মার সারথি

তুমি এইরূপ, সেইরূপ - সব রূপের সাক্ষী
হয়তো বা হৃদয়ের গভীরে জেগে থাকা বিশ্বস্ত কোন প্রহরী

তুমি দেখেছো পর্বতের অচলতা
দেখেছো সাগরের উন্মাদনা

তুমি গহীন বনের মাঝ দিয়ে হেটে যাওয়া উদ্ভ্রান্ত কোন পথিক,
হয়তো বা অজানা পথে পারি জমানো কোন ভবঘুরে ভাবুক

তুমি অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি
তুমি ক্লান্ত মাঝির সুরেলা কন্ঠের বেদনা ভরা সারি

তুমি দেখেছো আকাশের বিশালতা
দেখেছো পিপাসু মনের সঙ্কীর্ণতা

তুমি এক তীব্র অন্ধকার, প্রচণ্ড এক সঙ্কট
হয়তো বা আলোর মাঝে বাস করা জ্ঞান-তাপস

তুমি ক্লান্ত দুপুরে নিষ্পাপ প্রহরে হঠাৎ গর্জে ওঠা কোন আত্মার চিৎকার,
হয়তো বা শ্রোতা কোন মলিন বিমর্ষ মুখের না বলা কথার

সবশেষে দেখেছি আমি তোমাকে আমার মনের আয়নায়,
জানি না তুমি আসলেই কী? কেবল ভাবি তোমায়
মনে হয় আমরা আছি এক ঋদ্ধ আত্মার অবরুদ্ধ সত্তায়।

Thursday, 27 December 2007

কেউ কথা রাখেনি

কেউ কথা রাখেনি,

৩৩ বছর কাটলো

কেউ কথা রাখেনি।


ছেলেবেলায় এক বোষ্টমি তাঁর আগমণী গান,

হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল -

শুক্লা দ্বাদশীর দিন

অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে,

তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবষ্যা চলে গেল,

কিন্তু সে বোষ্টমী আর এলো না

২৫ বছর প্রতীক্ষায় আছি।


মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল -

বড় হও দাদাঠাকুর,

তোমাকে আমি তিনপ্রহরির বিল দেখাতে নিয়ে যাবো,

যেখানে পদ্মফুলের মাথায়, সাপ আর ভ্রমর খেলা করে।

নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো?

আমার মাথায় ঘরের ছাঁদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে,

তারপর তুমি আমায় তিনপ্রহরের বিল দেখাবে?


একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনও,

লাঠি লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা

ভিখিরির মত চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি -

ভিতরে রাস উৎসব;

অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে

সুবর্ণ কঙ্কন পড়া ফর্সা রমনীরা,

কত রকম আমোদে হেসেছে,

আমার দিকে তাঁরা ফিরেও চায়নি।


বাবা আমার কাঁধ ছুঁইয়ে বলেছিলেন -

দেখিস, একদিন আমরাও ...

বাবা এখন অন্ধ,

আমাদের দেখা হয়নি কিছুই;

সেই রয়্যাল গুলি,

সেই লাঠি লজেন্স,

সেই রাস উৎসব আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না;


বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে,

বরুণা বলেছিল -

যেদিন আমায় সত্যি কারের ভালবাসবে,

সেইদিন আমার বুকেও এরকম আঁতরের গন্ধ হবে।

ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি

দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়

বিশ্ব সংসার তন্য তন্য করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীল পদ্ম

তবু, তবু কথা রাখেনি বরুণা

এখন তাঁর বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ

এখন সে যে কোনো নারী।


কেউ কথা রাখেনি

৩৩ বছর কাটলো

কেউ কথা রাখেনা।।


কবিতা - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আবৃত্তি - শিমূল মুস্তাফা


Tuesday, 20 November 2007

একটি সাম্যবাদী মৃত্যুর কবিতা

তীব্র শৈত্যে জমে যাচ্ছি যে, একটু আগুন দে
কখন নিভেছে গনগনে আঁচ, ছাই ঘেটে দেখ গে

ফুল মালা আর ধুপের আগুন, আগুনের জলসায়
চার বেহারার পালকিতে চেপে কে যায়, জনতার রায়?

পূত-পবিত্র অগ্নি শিখার সে আগুন যাত্রায়
ঘুমাতে চলল অগ্নিপুত্র আগুনের শয্যায়

অগ্নি শিখায় জন্ম তোদের, অগ্নিতে নির্বাণ
বাঁচাটাও ছিল অগ্নিকুণ্ডে কি ভীষণ লেলিহান

বুকের মধ্যে দাবানল ছিল, এখন ভষ্মরাশি
অগ্নি নির্বাপন যন্ত্র কিনতে লগ্নিতে বিশ্বাসী

বিদায় অগ্নি, এখন লগ্নি, জমে যাচ্ছি যে
আবার আগুন হবার আগে একটু আগুন দে।

Tuesday, 23 October 2007

মিলনমেলা

অনেকদিন ধরে হাবিবুর বলে রেখেছিল, দশমীর দিন ফাঁকা রাখতে। প্রথমে কারণটা বলতেই চাইছিল না, অনেক জোরাজুরি করাতে বললো, এক জায়গায় নিয়ে যাবে। আমিও নাছোড় বান্দা। কয়েকদিন পর পরই ঘেন ঘেন করি - "বল না কোথায় নিয়ে যাবে?" শেষে পুজোর ঠিক কয়েকদিন আগে বললো টাকি যাবে, বাংলাদেশ সীমান্তে, ইছামতী নদীতে নাকি দূর্গা ঠাকুর ভাসান হয় (প্রতিমা নিরঞ্জন)। সেই উপলক্ষে উৎসবের পরিবেশ।

টাকিতে হাবিবুরের এক বন্ধু থাকে নাম মজনুর রহমান। আমরা নাকি প্রথমে তার বাড়িতে যাবো, তারপরে সে আমাদের নদীর নৌকা ঘাটে নিয়ে যাবে। আগের রাতে হাবিবুর আমাকে ফোন করে বললো, সকাল ১০:৫৫ তে শিয়ালদহ থেকে শিয়ালদহ-বনগাঁও শাখার ট্রেন ছাড়বে। যেহেতু শিয়ালদহ থেকে ট্রেন আমার বাড়ির কাছের রেল স্টেশন দম দম ক্যান্টনমেন্টে আসতে ১০ মিনিট লাগবে, আমি যেন সেইমত সময় হিসাব করে ১০:৩০ -র মধ্যে তৈরি হয়ে নেই। হাবিবুরের আবার ঐ দিনই কাউকে বিমানবন্দরে ছাড়তে যাবার কথা। আমার বাড়ি বিমানবন্দর থেকে খুব কাছে। তাই ঠিক হল, হাবিবুর আমার বাড়িতে আসবে আর আমরা একসঙ্গে যাবো। প্লেন ছাড়বে সকাল ১১ টায় এবং যাত্রিরা ১০:৩০ টার মধ্যে চেক ইন করবে। যাই হোক, হাবিবুর ওনাকে রওয়ানা করিয়ে ১০:৩০ র মধ্যে আমার বাড়িতে চলে এল। আমি একটু লেট লতিফ টাইপের। ও যখন এল, আমি তখনও তৈরি হইনি, ভাত খাচ্ছিলাম। হাবিবুরও লেট লতিফ টাইপের, ওও তারাতারিতে না খেয়ে চলে এসেছে। আমাকে খেতে দেখে ওর খিদে বেড়ে গেল। আমার মাকে বললো- "কাকিমা আমিও খাব, আমাকেও ভাত দিন"। দুই জনের খেয়ে রওয়ানা দিতে দিতে পৌনে এগারোটা বেজে গেল। আমার বাড়ি থেকে বেরিয়েই দুই পা দূরে স্টেশন যাবার রাস্তা। অটো রিকশার জন্য দাঁড়ালাম। দুটো ভর্তি অটো চলে যাবার পর যখন ব্যস্ত হয়ে ট্যাক্সিতে যাবার কথা ভাবছি, এমন সময় একটা ফাঁকা অটো দেখতে পেলাম। অটো সামনে আসার পরে অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম- ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন যাবেন? সে বললো যে না, পরের স্টেশন দূর্গানগর যাবে। আমরা অনন্যোপায় হয়ে যেতে রাজি হয়ে গেলাম, কিন্তু মনে ভয়ও হচ্ছিলো, ট্রেন মিস করতে পারি, বা ট্রেন গ্যালোপিং হলে ঐ স্টেশনে নাও থামতে পারে। যাই হোক, দশ মিনিটের মধ্যে দূর্গানগর স্টেশনে পৌছে গেলাম। টিকিট কাটতে গিয়ে শুনি, ট্রেন শিয়ালদহ থেকে ১০:৫৫ না ১১:৫৫ তে ছাড়বে। হাবিবুর বললো, তাহলে হয়ত মজনুর বলতে ভুল করেছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এই স্টেশনে দাঁড়িয়ে না থেকে, পরের যেকোনো ট্রেনে বারাসত চলে যাবো কারণ, বারাসত একটা সদর স্টেশন। ট্রেন গ্যালপিং হলেও বারাসতে অবশ্যই থামবে। সময় মত হাসানাবাদ লোকাল এল এবং আমরা বারাসত থেকে ঐ ট্রেনে উঠে পড়লাম। মজনুরের বাড়ি আসলে টাকি থেকে একটু দূরে নিমদাড়িয়া স্টেশনের কাছে। দুপুর ২:২০ নাগাদ আমরা নিমদাড়িয়া স্টেশনে নেমে পড়লাম। স্টেশনে আমাদের জন্য মজনুর অপেক্ষা করছিল। আমার সাথে মজনুরের পরিচয় ছিল না। পরিচয় সেরে মজনুরের মোটর বাইকে আমারা তিন জনে উঠে পড়লাম। ওর বাড়ি পৌছিয়ে দেখি ঐখানে মজনুরের আরও দুই বন্ধু মাহ্‌রুফ আর তপন। ওদের সাথে পরিচয় পর্ব মিটে যাবার পর, মজনুর বললো- খাবে চল। আমি বললাম- সে কী? আমরা তো খেয়েই এসেছি। ও বললো- সে তো অনেক আগে খেয়েছো। খেতেই হবে, বলে জোর করে দোতলায় নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি মুরগীর মাংস আর ভাতের ব্যবস্থা করে রেখেছে। এতক্ষণের লৌহ শকট যাত্রায় একটু একটু খিদেও পেয়েছিল, তাই কথা না বাড়িয়ে খেয়ে নিলাম। খেয়েই রওয়ানা হয়ে গেলাম টাকির উদ্দেশ্যে। একটা সাইকেল ভ্যান ভাড়া করা হল। ১৫ মিনিটের মধ্যে ইছামতী নদী তীরে উপস্থিত হয়ে গেলাম।

গিয়ে দেখি, প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে ইছামতী সীমান্তে দুই বাংলার মিলনমেলা। দুই পারে হাজার হাজার মানুষ। ইছামতী নদীতে ছিল বাংলাদেশ-ভারতের কয়েক শ রকমের নৌকা আর ট্রলার। ও পারে সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলা। কয়েকঘন্টার মিলনমেলায় হিন্দুরাই শুধু নয়, দুই বাংলার সব ধর্মের মানুষ ভিড় করে।

তপন বেশ করিৎকর্মা ছেলে ও-ই বড় একটা মোটর নৌকাতে আমাদের যাবার ব্যবস্থা করলো।

এলাকাবাসী থেকে জানলাম, দেশ বিভাগের অনেক আগে থেকেই ইছামতী নদীর উভয় তীরে দুর্গাপূজার শেষ দিন বিজয়া দশমীতে মেলা বসে আসছে। দেশ বিভাগের পরও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি দুই বাংলার সীমারেখা। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে এ মেলা কখনো বন্ধ হয়নি। সারা বছর ধরে শুধু ইছামতী নদীর পারের মানুষ নয়, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এ দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে ইছামতীর উভয় পারে বসে নানা রকমের দোকান। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ছাড়াও এখানে আসা মানুষ কিছু কেনাকাটা করে সন্ধ্যার পরে ফিরে যায় যে যার দেশে, যে যার ঘরে।

ভারতের পাশে টাকী আর বাংলাদেশের পাশে দেবহাটা, মাঝখান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে বয়ে যাওয়া সীমান্তনদী ইছামতী বিভক্ত করেছে দুই দেশকে। ইছামতীতে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যতদুরে চোখ যায় ভেসে বেড়াচ্ছে নৌকা আর নৌকা। নদীতে বাংলাদেশের জলসীমানায় টহল দিচ্ছে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) স্পিডবোট আর ভারতের জলসীমানায় টহল দিচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) স্পিডবোট। নদীতীরে দাঁড়িয়ে আনন্দ উপভোগ করছে কয়েক হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য বসে অন্য রকম মেলা, সৃষ্টি হয় অন্য রকম দৃশ্য। এখানে না এলে বিশ্বাস করা কঠিন এ মিলনমেলার অনুভুতি। আমার সব থেকে ভালো লেগেছে উভয় দেশের নৌকা থেকে ছুড়ে ছুড়ে উপহার (লজেন্স, আখ, সসা, কলা, পলিথিন পাউচে জমানো শরবতের বরফ, সিগারেট, খুচরা পয়সা ইত্যাদি) বিনিময়। উভয় দেশের সাধারণ মানুষের আন্তরিকতায় আমি যারপরনাই মুগ্ধ।

স্থানীয় অনেকে বলেন, ‘বিজয়া দশমীতে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে ইছামতীর তীরে দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলা বসে। এটি এখন আমাদের সাংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। এখানকার অন্যরকম আনন্দ উপভোগ করতে প্রতিবছর ছুটে আসি।’

দীর্ঘদিন ধরে উভয় দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সীমান্তনদী ইছামতীতে প্রতিমা বিসর্জন দেয় (এখন অবশ্য হিন্দু জনসংখ্যার প্রধান অংশ ভারতে চলে যেতে বাধ্য হওয়ায় এবং নানা কারণে বাংলাদেশে দূর্গাপূজার সঙ্খ্যা অনেক কমে গেছে)। এ উপলক্ষে যে মেলা বসে সেখানে অংশ নেয় দুই দেশের হিন্দু-মুসলমান কয়েক হাজার মানুষ। বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এ প্রথা।

সন্ধ্যাবেলায় শুরু হল আকাশে আতসবাজির খেলা। ফেরার সময় নদীর পারের রাস্তা দিয়ে আমরা যখন ফিরছি, তখন ভিড়ের চাপে পিষ্ট হবার জোগাড়।


পুনশ্চঃ আমার মা এবং বাংলাদেশের আমার এক প্রিয় বন্ধু প্রতিজ্ঞা এবং কসম খাইয়েছিল আমি যেন নৌকাভ্রমণ না করি। তাদের কথা না রাখার জন্য দুঃখিত। আসলে বন্ধুরা চাপ দেওয়াতে নৌবিহার করতে রাজি হয়ে যাই, কারণ আমি না গেলে ওদেরও যাওয়া বন্ধ হয়ে যেত আর আমরা যে এত আনন্দ করেছি, সেইটাও হত না। মরতে তো একদিন হবেই, তা বলে রোজ রোজ ভয়ে বেঁচে থাকায় কোনো মজা নেই। জীবনে একটু আনন্দ-উত্তেজনা ভালো। তা বলে আমরা বেপরোয়া হইনি। দূর্ঘটনা এড়াতে বড় নৌকা ভাড়া করেছিলাম। ছোট নৌকাতেই দূর্ঘটনা বেশী হয়, এবং আমাদের চোখের সামনে হয়েছেও।


















আরও ছবি দেখতে ক্লিক করুন:


বাংলাদেশের কিছু তথ্য সংগৃহীত দৈনিক প্রথম আলো থেকে।

Thursday, 18 October 2007

রেশমী ও সুস্মিতের গল্প


সুস্মিত একটু বোকা আবোধা প্রকৃতির ছেলে, কোনো কিছুই সে চট করে বুঝতে পারে না। সামান্য জিনিস বুঝতেও তার অনেক সময় লাগে। রেশমীর ব্যাপার স্যাপার, মন মেজাজ সে আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। একেতেই নারীর মন, বড়ই জটিল, দেবা না জানন্তি। তার উপর রেশমী কখন হেসে ওঠে, কাঁদে, আহ্লাদ করে, এই রোদ তো এই মেঘলা, সুস্মিত কিছুই ধরতে পারে না। সুস্মিত আগে তো কিছুই বুঝতে পারতো না, কিন্তু আস্তে আস্তে সুস্মিত একটু একটু করে বোধসম্পন্য হচ্ছে, চালাক হচ্ছে। এখন সে অনেক কিছুই ধরতে পারে রেশমীর আচরণ, ব্যবহার। সুস্মিত উপলব্ধি করতে পারে - রেশমী কথায় কথায় কারণে অকারণে হাসছে মানে রেশমীর মন ভাল নেই, বা কাঁদছে মানে রেশমী একান্তভাবে সুস্মিতকে পেতে চাইছে, বা সুস্মিতকে খুব গালমন্দ করছে, আচড়ে দিচ্ছে, খামচে দিচ্ছে, নাক কান টেনে দিচ্ছে মানে আহ্লাদ করছে।
অনেক সময় অকারণে রেশমী সুস্মিতের সাথে ইচ্ছে করে পায়ে পা লাগিয়ে এমন ঝগড়া করে, সুস্মিত বুঝে উঠতেই পারে না যে সে কী এমন করলো। আসলে কারেন্ট অফ না হলে সুন্দর জোৎস্না বোঝা যায় না, রেশমীও অকারণে ঝগড়া করে দেখে নিতে চায় সুস্মিত তাকে ঠিক কতটা ভালবাসে।

*** *** *** *** ***

সুস্মিত এক মধ্যবিত্ত বাঙ্গালি হিন্দু পরিবারের ছেলে। আর রেশমী এক উচ্চবিত্ত বাঙ্গালি মুসলমান পরিবারের মেয়ে। তারা বাঙ্গালি, এইটাই তাদের মুখ্য পরিচয় হবার কথা কিন্তু তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে কে হিন্দু আর কে মুসলমান এইটা বলার কী দরকার? দরকার ছিল না, কিন্তু কতিপয় সুযোগসন্ধানী ও অবাঙ্গালির দ্বিজাতিতত্ত্বের জন্য সমগ্র বাঙ্গালি জাতি আজ দ্বিধাবিভক্ত। বাঙ্গালিত্ব আজ গৌন, ধর্মই মুখ্য হয়ে দাড়িয়েছে। ভালবাসাটা যেন অভিশাপ আর সেটা যদি হয় গরীবের আর বড়লোকের, আর সেটার গায়ে যদি ছাপে হিন্দু-মুসলমানের ছাপ। প্রেম তো তাদের জন্য নয়, যেন বড়লোকের কেনা জায়গির। সুস্মিত প্রেম করেছিল রেশমীর সাথে, মেয়েটি ভীষণ সিধা সাদা নিরহঙ্কার। সুস্মিত মুগ্ধ চোখে তাকিয়েছিল তার নিষ্পাপ মুখের দিকে। তখনও তো সে জানতো না, কি আছে তার মনের ভিতর। ছিল শান্তি আর সুখ যা ছুতে পেরেছিল সুস্মিত। চেয়েছিল ধরে রাখতে সারা জীবন ধরে। মেয়েটি চোখ নামিয়ে বলেছিল - আমার নাম রেশমী। সেই দিন থেকেই শুরু তাদের সুখের স্বপ্ন দেখা। ভুলে ছিল কিছুদিন কত কষ্ট কত জ্বালা, ভেবেছিল তারা জয়ী, গড়বে সুখের বাসা। তখনও তারা জানতো ঠিক পথ ধরেই চলছে। তারা যে সমাজের শিক্ষিতের দল, জাত ধর্মে বিশ্বাস করে না। কে বড়লোক আর কে গরীব, পরোয়া করে না। শিক্ষা তাদের সম্পদ যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। বরং স্পর্শ করবে, আলোকিত করবে অন্ধকার। তারা হবে সমাজের দৃষ্টান্ত, তাদের দেখবে সারা সমাজ। তারা থাকবে তাদের নিজেদের ধর্ম নিয়ে, কেউ ধর্মান্তরিত হবে না কারণ তারা বিশ্বাস করতো ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে না।

এই তো অল্প কিছুদিন আগের কথা। রেশমী নামের ছোট মেয়েটা বড় হয়ে উঠতে লাগলো। আর বড় হতে হতে একটা সময় আসে যখন মনে হয় নদী শরীরের ভিতরেই বইছে, গোলাপের কুঁড়ি ফুটছে নিজের অন্দরে, চাঁদ ওর জোৎস্না ঢালছে তারই জন্য। চারিদিকে বাবা-মা, ভাই-বোন, কাকা-কাকি, ফুপু-খালা ঘিরে থাকলেও চোখ দুটো ছটফট করে খোঁজে প্রিয়তমকে, যে তার মনে তুলবে সুরের মুর্চ্ছনা, অঙ্গে অঙ্গে বাজাবে বাঁশি। রেশমীরও হল সে হাল। আর, ওমা মিলেও গেল এক পুত্তুর! না, রাজপুত্তুর নয়, বণিকপুত্তুরও নয়, ভিনধর্মী এক চিত্রকর। তুলি-কলম নয়, সে ছবি আঁকে মাউস ঘষে। সে ছবি ফুটে ওঠে মনিটরে। নড়ে-চড়ে, কথা বলে, সে এক দারুণ ব্যপার। সবাই বলে মাল্টিমিডিয়া এ্যানিমেশন।

আপু, ফুপু, সবাই রেশমীকে বলে, পাগল হলি তুই? কেউ মানবে তোর এই পাগলামি? প্রাসাদের দেওয়ালগুলো ফিস ফিস করে বলে, সাবধান রেশমী! জানো না, ওর কী হয়েছিল? তার কী হয়েছিল? রেশমী জানে, এ সব জেনে তার লাভ নেই। সে তো তার মন আর শরীরকে জেনেছে, সে আর ভয়কে জেনে করবে কী? সাত পুরুষের পরম্পরা বলে, ছিঃ, এ সব কী? বিধর্মীর ঘরে যাবে আমাদের মেয়ে? প্রেম আবার কী? পরিণয় একটা বিনিময়। রেশমীর বড় ভাইয়েরা এবং তাদের চামচেরা শাসানি দিল সুস্মিতকে, যদি আর কোন দিন রেশমীর সাথে তাকে দেখা যায়, তবে জানে মেরে দেবে।

এদিকে সুস্মিতের আত্মীয়-পরিজনেরাও ছিঃ ছিঃ করলো। অনেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। মামা-মামিরা তির্যক মন্তব্য করলো। কেউ বললো- যাদের জন্য চোদ্দো পুরুষের ভিটা-মাটি ছেড়ে চলে আসতে হল, তুই কিনা তাদেরই একজনের মেয়েকে ঘরের বউ করবি? সুস্মিত বুঝতে পারে না, কেউ অন্যায় করলে তার খেসারত অন্য কাউকে কেন দিতে হবে?

বাবা বললো- তুমি যা করতে যাচ্ছো, জানো তার জন্য তোমার বোনের বিয়ে নাও হতে পারে। কে এই রকম মেয়ের সাথে তার ছেলের বিয়ে দেবে, যার দাদা কিনা একজন মুসলমানের মেয়েকে ঘরে তুলেছে? সুস্মিত বাক্‌রুদ্ধ হয়ে যায়। একমাত্র মা তার সাথে আছে। মা বলে- বাবা, তুমি যাকে নিয়ে ঘর করলে সুখি হবে, আমি তাকেই মেনে নেব। কারও জন্য তুমি তোমার জীবন নষ্ট করো না। মা'র কথায় সুস্মিত মনে অনেক বল পেল।

*** *** *** *** ***

এই বছর ঈদ-উল-ফিতর ও দূর্গা পূজা কাছকাছি দিনে পড়েছে। রেশমী তার বান্ধবীদের নিয়ে গেছে ঈদের কেনাকাটা করতে এক অভিজাত শপিং মলে। রেশমীর বান্ধবীগুলো এক একটা ফাজ়িলের হদ্দ। সমানে ইয়ার্কি ফাজ়লামি করে যাচ্ছে। কিন্তু রেশমীর সেইদিকে মন নেই। তার চোখ খুঁজছে আরেকজনকে। হ্যাঁ, এই দোকানটার সামনেই তো সুস্মিত থাকবে বলেছিল। কিন্তু কই সে? সে তো কোনো দিনো দেরী করে না। প্রত্যেক দিনই তো সে রেশমীর থেকে এক ঘন্টা, আঁধ ঘন্টা আগে চলে আসে। রেশমীর মনে অনেক দূর্ভাবনা হতে থাকে।
এইদিকে, সুস্মিত আসলে অনেক আগেই চলে এসেছিল, কিন্তু রেশমীর বান্ধবীদের পুরো ব্যাটেলিয়ান দেখে, ঘাবড়ে গিয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। রেশমীর চঞ্চলতা দেখে একটু মজাও পেয়েছে। রেশমীর কাছে, সুস্মিতের অনুযোগ ছিল যে সে রোজই দেরী করে আসে আর তাকে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আজকে সুযোগ পেয়ে সুস্মিত সেই অভিমান উসুল করে নিচ্ছে। কিন্তু সুস্মিতের আর ভাল লাগছে না, রেশমীর অসহায়তা দেখে তার নিজেরও খুব খারাপ লাগছে। নিষ্ঠুরের মত সে আর লুকিয়ে থাকতে পারছে না।
সুস্মিতকে পেয়ে রেশমীর বান্ধবীরা রব তুললো, তাদের রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে হবে। এত জনকে খাওয়াতে হবে দেখে সুস্মিত প্রমাদ গুনলো। সামনে পুজো, সবাইকেই কিছু না কিছু দিতে হবে, পুজোর বোনাস এখনও পায়নি। পাবে কিনা ঠিকও নেই, কোম্পানির যা অবস্থা, বেতনই ঠিক মত হচ্ছে না আবার বোনাস! সুস্মিতের মুখ দেখেই রেশমী ব্যাপারটা বুঝে গেল। সে খেঁকিয়ে বান্ধবীদের ফাজ়লামির সুরে বললো - তোদের লজ্জা করে না? কোথায় আমাদের একটু নির্জনতার মধ্যে প্রেম করার ব্যবস্থা করে দিবি, তা না, কাবাব মেঁ হাড্ডি হতে চাইছিস!
সুস্মিত, রেশমীকে নিয়ে শপিং মলের দোতলায় একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। রেশমী বললো - প্লিজ়, আজকে সবার সামনে বসবো না, চলো আজ একটা প্রাইভেট কেবিনে বসি।


রেস্টুরেন্টটা বেশ ভাল। হাল্কাভাবে একটা হিন্দী গান ভেসে আসছে -
"প্যাহলী বারিশ ম্যায় অর তু,
দূর সে ভিনি খুশবু আয়ে
আব ক্যা হো গা আনজাম
খুদা জানে ..."

সুস্মিত আর রেশমী দুজনের মন-মেজাজটা আজকে খুব রোম্যান্টিক হয়ে আছে।

রেশমী: এই জানো, তোমার ফোন কল পেয়ে আজকে আমার ঘুম ভেঙ্গেছে। আজকে অনেক দিন পর তোমার সাথে দেখা হবে ভেবে সকাল থেকে একটা অদ্ভুত শিহরণ হচ্ছিল। কাল তোমার সাথে কত ঝগড়া করেছি ফোনে, তবুও মনে মনে আশা করছিলাম, তোমার কল আসুক, কল আসুক। তুমি কল করার পরে খালি মনে হয়েছে, তোমাকে কাল কত আঘাত দিয়েছি, কত আবল তাবল কথা বলেছি।

সুস্মিত: বাদ দাও। আমি জানি, কাল তুমি কোনো কথাই মন থেকে বলনি। তুমি বলতে পারো না, কারণ ...

রেশমী: কী কারণ?

সুস্মিত: কারণ, তুমি যে আমাকে কত ভালবাসো, আমি তা জানি।

রেশমী: না জানো না। কতটা ভালবাসি?

সুস্মিত: জানি না, যাও।

রেশমী: রাগ করছো কেন সোনা? তোমাকে রাগাচ্ছিলাম। তোমাকে ভালবাসতে পারলে যে কেউ ধন্য হবে।

সুস্মিত: আহা! তুমি এই কথা বলাতেই আমি খুব খুশী হয়েছি। আমার আর কিছু চাই না। আমি ধন্য।

রেশমী: খুশী হবার মত এমন কিছু বলিনি। তুমি এমন ভাবে বল যেন তুমি নগন্য একটা মানুষ। অথচ তোমার জন্য মানুষ তুচ্ছ ভাবতে পারে নিজেকে, তুমি কারও চোখে অসাধারণ হতে পারো, আর তোমাকে নিয়ে কারও অনেক বড় পাগলামি থাকতে পারে। তুমি এইটা অনুভব করতে পারো না কেন?

সুস্মিত: তুমি প্রেম-ভালোবাসা বলতে কী বোঝ?

রেশমী: (লাজুক হাসি হেসে) আমি ভালবাসা বলতে বুঝি- যেমন ধর, তোমার গা ঘেসে কেউ ঘুমাচ্ছে, তুমি তার নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছো, ইচ্ছে করলেই একটু ছুঁইয়ে দেখতে পারছো ... অবাক চোখে তোমার খুব নিজের একটা মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করছো। আর আমার নিজের একান্তভাবে যা মনে হয়, মানে আমার নিজের যা চাওয়া তা হল- কারও বুকের কাছে লুকিয়ে শান্তির একটা ঘুম, আর মাঝে মাঝে পাস ফিরতে গিয়ে তার গায়ে পা তুলে দেওয়া ... হা হা হা হা !
ব্যস, আর জানি না। আমার কল্পনার দৌড় এই অবধি। এর পরে কি হবে জানি না। এবার তুমি বল, ভালবাসা বলতে কি বোঝ?

সুস্মিত: আমি ভালোবাসা বলতে বুঝি, দুজনে দুজনায় হারিয়ে যাওয়া। দুজনের আলাদা অস্তিত্ব থাকবেনা। এক হয়ে যাবো।

রেশমী: (ফাজিল হাসি হেসে) এক হয়ে যাবে মানে? কি করে? ধুর! কী যে বল? তাহলে ডাকাতের মত আচরণ কে করবে? হা হা হা হা !

সুস্মিত: (লাজুক অথচ ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে) ডাকাতের মত আচরণ? হা হা !! সে তো আরও পরে। যখন তাদের মধ্যে একটা সুতোরও ব্যবধান থাকবে না, কাপড় তো দূরের কথা।

রেশমী: (নকল রাগ দেখিয়ে) তোমরা ছেলেরা খালি একটা জিনিসই জানো!

সুস্মিত: তাই? হা হা হা হা !

রেশমী: কিন্তু তোমার রোমান্টিকতায় আমি মুগ্ধ।

চোখে চোখ, হাতে হাত রেখে দুজনেই অনেক ক্ষণ মুখোমুখি চুপ চাপ বসে রইল। সম্বিত ফিরলো রেস্টুরেন্ট বয়ের আগমনে।

বয়: ইয়োর অর্ডার প্লিজ়।

... ... ...

আর তিন মাস পর সুস্মিত ও রেশমীর শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন হবে। আপনারা সবাই আশীর্বাদ করবেন যেন নবদম্পতি চিরসুখি হয়।।

Tuesday, 14 August 2007

ভারতের নবজাগরণ - পর্ব ২


৬০ বছর আগে আজকের দিনে মধ্যরাতে, ১০০০ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের মুক্তি ঘটে। অনেকে হয়তো ভ্রু কুঁচকে বলবেন - সে কী, ভারতীয় উপমহাদেশ তো মাত্র ২৫০ বছর ইংরেজদের অধীনে ছিল। তাহলে ১০০০ বছরের পরাধীনতার মানে কী?

আমি এইজন্যেই ১০০০ বছরের পরাধীনতা বলেছি কারণ, ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্টের পূর্বে, ভারতীয় উপমহাদেশ বিদেশী শাসকের দ্বারা শাসিত, শোষিত, উপকৃত, অপকৃত হয়ে এসেছিল। শাসকেরা কেউই স্থানীয়, দেশীয় বা উপমহাদেশীয় ছিল না। তাদের সভ্যতা ছিল বিদেশী, তাদের সংস্কৃতি ছিল বিদেশী। অনেকে হয়তো বলবেন - দেশী বা বিদেশী তো আপেক্ষিক। যুগ যুগ ধরে মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়েছে, বসতি স্থাপন করেছে আর সেই উপনিবেশকে নিজের করে নিয়েছে। কিন্তু তবুও বলি, প্রায় সাত থেকে পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে, তিলে তিলে একটি মিশ্র সভ্যতা গড়ে উঠেছিল দেশীয় অনার্য (অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়), তিব্বতি মোঙ্গলীয় ও আর্য (পূর্ব ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত) জাতির মিশ্রণে। পাঁচ হাজারেরও অধিক বছর একত্রে থাকার ফলে একটি সভ্যতা গড়ে ওঠে। এক জাতি এক প্রাণ হয়ে যায়। কিন্তু ১০০০ বছর পূর্বে তুরষ্ক (এশিয়া মাইনর) ও পশ্চিম এশিয়া এবং সর্বশেষে ইউরোপ থেকে যখন বিদেশী শত্রুরা এই অঞ্চলে আসে বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে, তখন এই অঞ্চলের স্থানীয় রাজাদের হাত থেকে শাসন ক্ষমতা আস্তে আস্তে চলে যায় বিদেশীদের হাতে। দেশীয় রাজাদের রাজত্বে আমরা সুখে ছিলাম কিনা, অত্যাচারিত হচ্ছিলাম কিনা, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন কারণ, যাই হোক না কেন, হচ্ছিলাম নিজেদের লোকেদের দ্বারা। বিদেশী ভূ-পর্যটকদের লেখা থেকে জানতে পারি যে অন্তত, আমরা খেয়ে-পড়ে বেঁচে ছিলাম। হয়তো সাধারণ লোকজন খুব আড়ম্বর জীবন যাপন করতো না, কিন্তু খেয়ে-পড়ে শান্তিতে ছিল। কিন্তু বিদেশীরা তো আমাদের খাইয়ে, পড়িয়ে, সুখে, শান্তিতে রাখবে বলে তো এদেশে আসেনি। তাদের, এই দেশের লোকেদের উপর মায়া, মমতা থাকার কথাও না। পরিণামে যা হবার তাই হল, আমাদের স্বাধীনতার সূর্য ক্রমে ক্রমে অস্তমিত হল। আমাদের নিয়তি আমাদের ১০০০ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করলো। আমরা হয়ে গেলাম গোলাম জাত। আমাদের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন ঘটল, আমাদের শিরদাড়া গেল নুব্জ হয়ে। সেই ট্র্যাডিশন আমরা এখনও বহন করে চলেছি। এখনও সাহেব দেখলে আমরা গদ-গদ হয়ে পড়ি। চাকর-নফর মানসিকতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে।

যাই হোক, আজকের দিনে ৬০ বছর আগে, আবার সাধারণ দেশীয় জনগণের হাতে ক্ষমতা আসে, স্বাধীনতা আসে দ্বিখন্ডিত হয়ে। রাতারাতি ভারতবর্ষ হয়ে যায় - ভারত আর পাকিস্তান। এক জাতি হয়ে যায় দ্বি-জাতি। হায় অদৃষ্ট!!! এই দ্বি-জাতিতত্ব যে কত ভুয়ো তার প্রমান আমরা পেয়েছি ১৯৫২ তে ১৯৭১-এ।

আমরা হয়ত এখনও আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা পাইনি, অনেক ত্রুটি আছে, বিচ্যূতি আছে, দূর্নীতি আছে। কিন্তু কোন দেশই বিচ্যূতিহীন নয়, তাকে দোষহীন আদর্শ বানাতে হয়। আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি, আমাদের আরও অনেক কিছু অর্জন করার আছে। আমাদের হাতে এখনও অনেক কাজ বাকি।


Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.


* Applicable for M.S. Windows XP

Monday, 13 August 2007

ভারতের নবজাগরণ - পর্ব ১, চন্দ্রায়ণ (চন্দ্রযান-১)

ভারতের ৬০ তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে, ভারতের গৌরবজনক কয়েকটি কৃতিত্ব ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছে আছে। এই পর্যায়ে ভারতের মহাকাশ গবেষণা ও আগামী চন্দ্রাভিযান সম্পর্কে কিছু তথ্য উপস্থাপন করলাম।


মিডিয়ার কল্যাণে এই মুহূর্তে মনে হয় কারোরই আর জানতে বাকি নেই যে আর কিছুদিনের মধ্যেই চাঁদে পৌঁছে যাবে আমাদের চন্দ্রযান-১ এবং এই ব্যাপারে যে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)'র সঙ্গে ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা)'র একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে সে খবরটাও অনেকেরই জানা। তবে, এক্ষেত্রে প্রথমেই চাঁদে পৌঁছে যাবে বলাটা মনে হয় একটু ভুল হ'ল - কারণ, সে অর্থে চন্দ্রযান চাঁদে গিয়ে পৌঁছবে না। মানে, সরাসরি গিয়ে চাঁদের মাটিতে নামবে না। তার বদলে চাঁদের ১০০ কিলোমিটার ওপর দিয়ে আবর্তন করবে আর সেই সঙ্গে চালাবে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা। যেমন, রিমোট সেন্সিং পদ্ধতির সাহায্যে দূর থেকেই চাঁদের বুকে খোঁজ চলবে নানান খনিজ পদার্থের। চাঁদের মেরু অঞ্চলে বরফের খোঁজ করা হবে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি হবে চাঁদের মানচিত্র। চাঁদের বিভিন্ন পদার্থ থেকে রঞ্জনরশ্মির বিকিরণ নিয়েও চলবে গবেষণা।

সেই কবে ১৯৬৯ সালে চাঁদের মাটিতে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রেখেছিলেন নীল আর্মস্ট্রং । তার আগেও তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিলে গোটা চল্লিশ মহাকাশযান পাঠিয়েছিল চাঁদে। আর, তার পরে তো আরও অজস্র মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে। বস্তুত, সেই ঠান্ডা যুদ্ধের গোটা সময়টা জুড়ে, বিশ্বশক্তির দুই মেরুর মধ্যে এই নিয়ে এক ধরণের রেষারেষির সৃষ্টি হয়েছিল। এই সব অভিযানে চাঁদ থেকে নিয়ে আসা মাটি, পাথর নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাও কিছু কম হয়নি। আর, সেসবের ফলে জানাও গেছে নানা নতুন তথ্য। পরবর্তী সময়ে এই উৎসাহে অবশ্য খানিকটা ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। যাই হোক, চাঁদের মাটিতে শেষবারের মতো মানুষের পা পড়েছিল ১৯৭২ সালে। সুতরাং, এ সবের আরো এত বছর পরে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আবার অতি পরিচিত সেই চাঁদে মনুষ্যবিহীন একটা মহাকাশযান পাঠানোর তাৎপর্য কী? এই জাতীয় একটা প্রশ্ন অনেকের মনেই আসতে পারে। তাই সবচেয়ে আগে দরকার এই ব্যাপারটা নিয়ে দু'একটা কথা বলা।

মানুষের প্রথমবার চাঁদে পা রাখার এত বছর পরেও আজও চাঁদ সম্পর্কে অনেক কিছুই আমাদের অজানা। সত্যি কথা বলতে কি, মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কাছে চাঁদ আজও একটা বিরাট রহস্য। প্রথমত, সৃষ্টির প্রসঙ্গ। চাঁদের সৃষ্টি ঠিক কিভাবে হয়েছিল সেই ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি। মনে করা হয়, আজ থেকে মোটামুটিভাবে ৪৫ বিলিয়ন বছর আগে, পৃথিবী যখন পুরোপুরি কঠিন অবস্থায় আসেনি, ঠিক সেই সময়ে বেশ বড় আকারের কোন মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষের ফলে পৃথিবীর বাইরের দিকের বেশ কিছুটা অংশ ছিটকে মহাকাশে চলে গিয়েছিল। এটিই পরবর্তী সময়ে কঠিন হয়ে জন্ম দিয়েছিল চাঁদের। এই তথ্যের সমর্থনে যুক্তিও আছে অনেক। যেমন, চাঁদের মাটি, পাথর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে পৃথিবীর বাইরের দিকের অংশের মতো তাতেও লোহার পরিমাণ কম। কিন্তু, এসবের পরেও অনেক প্রশ্ন থেকে যায়।

আর একটা মজার ব্যাপার হ'ল, সাধারণভাবে সৌরমণ্ডলের আর সব গ্রহ আর তাদের উপগ্রহের মধ্যে আকৃতির যে অনুপাত সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়, পৃথিবী আর চাঁদের বেলায় সেটা বেশ একটু অন্য রকমের। অন্য গ্রহগুলির ক্ষেত্রে তাদের তুলনায় উপগ্রহগুলি বেশ ছোট মাপের। পৃথিবীর তুলনায় চাঁদ কিন্তু মোটেও অত ছোট নয়। কিভাবে এত বড় একটা চাঁদ আমাদের কপালে জুটলো, মতান্তর রয়েছে তা নিয়েও। তারপরে, চাঁদের দক্ষিণমেরু অঞ্চলের অ্যাইটকিন অঞ্চল নিয়েও বিজ্ঞানীমহলে কৌতূহল আর জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, সাম্প্রতিককালে চাঁদে পাঠানো হয়েছে একাধিক মহাকাশযান আর সেগুলি থেকে পাওয়া নানা রকম তথ্য জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্কের। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে চাঁদ নিয়ে নতুন করে গবেষণা ভীষণরকম জরুরি।

এখন প্রশ্ন হ'ল, আমাদের চন্দ্রযান-১ কিভাবে বা কতটা সেই প্রয়োজন মেটাতে পারবে বা এক কথায় কেমন হবে সেই গবেষণা ? এই প্রসঙ্গে বলা যায়, চন্দ্রযান একসঙ্গে অনেকগুলি বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান চালাবে যা এই প্রথমবারের জন্য হতে চলেছে। এই নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ করাই যায়, তবে, তা না করে বরং দু'একটির উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো একটু পরিষ্কার হতে পারে। যেমন, উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে চন্দ্রপৃষ্ঠের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হবে। রিমোট সেন্সিং বা দূর-সংবেদী আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সন্ধান চালানো হবে নানা রকম খনিজ পদার্থের। চাঁদের বিভিন্ন পদার্থ থেকে রঞ্জনরশ্মি নির্গত হয়। চন্দ্রযানের উন্নত যন্ত্রপাতি এইসব রঞ্জনরশ্মি বিশ্লেষণ করে চাঁদের বিভিন্ন পদার্থ সম্পর্কে নানা রকম তথ্য সংগ্রহ করবে। এইভাবে চাঁদের বুকে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি পদার্থের অস্তিত্বের ব্যাপারে অনেক কিছু জানতে পারা যাবে।

বিভিন্ন মহাকাশ অভিযান থেকে নিয়ে আসা চাঁদের মাটি, পাথর পরীক্ষা করে চাঁদে জলের অস্তিত্বের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন প্রমাণ এতদিন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ব্যাপারটা একটা অনুমানের পর্যায়েই ছিল। অবশ্য, তার একটা কারণও আছে। চাঁদের সূর্যালোকিত অংশ প্রচন্ড উত্তপ্ত, তাপমাত্রা ১৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মতো। অন্যদিকে, অন্ধকার অংশ আবার ততোধিক শীতল, তাপমাত্রা মাইনাস ১৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। স্বাভাবিকভাবেই তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা যে চাঁদের আলোকিত অংশ থেকে সমস্ত জলীয় পদার্থ বাষ্পীভূত হয়ে এই অন্ধকার অংশের শীতলতায় কঠিন হয়ে জমা হয়েছে। সম্প্রতি এই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে একটি ঘটনা। ১৯৯৮ সালে নাসা চাঁদে পাঠিয়েছিল লুনার প্রসপেক্টর। তার নিরীক্ষণে ইঙ্গিত মিলেছে চাঁদের মেরু অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেনের যৌগ রয়েছে যা বরফ হলেও হতে পারে। সুতরাং, চাঁদে জল থাকার ব্যাপারটা এখন আর ঠিক অতটা অনুমানের পর্যায়ে নেই। চন্দ্রযান আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে চাঁদের মেরু অঞ্চলে বরফের খোঁজ করবে এবং গবেষণা করবে বাষ্পীভূত পদার্থের চলাচলের বিষয়ে। সর্বোপরি, এইসব নানা গবেষণায় যে সব তথ্য পাওয়া যাবে সেগুলির সাহায্যে সৌরমণ্ডল তথা চাঁদের উত্পত্তি ও ক্রমবিবর্তনের ব্যাপারে নতুন করে আলোকপাত করা সম্ভব হবে।

এতসব করার জন্য, বলাই বাহুল্য, আধুনিক আর উন্নতমানের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হবে এবং এই একটি ক্ষেত্রেই আক্ষরিক অর্থে ব্যাপারটা আর শুধু এদেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অর্থাৎ, চন্দ্রযানে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি যন্ত্রপাতির পাশাপাশি থাকছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তৈরি নানা রকম যন্ত্রপাতি। যেমন, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় আর নাসা'র অনুদানপ্রাপ্ত জেট প্রপালশন গবেষণাগারের যুগ্ম উদ্যোগে তৈরি মুন মিনেরোলজি ম্যাপার। এই যন্ত্রটি চাঁদের বুকে বিভিন্ন খনিজ পদার্থের অস্তিত্বের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাবে। চাঁদের মেরু অঞ্চলে বরফের খোঁজ করবে মিনি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার বা সংক্ষেপে মিনি সার। এটিও একটি মার্কিন যন্ত্র যা তৈরি হয়েছে নাসার সাহায্যে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকছে জার্মানিতে তৈরি একটি নিয়ার ইনফ্রারেড স্পেকট্রোমিটার যা বিভিন্ন খনিজ পদার্থের অনুসন্ধান করবে। আরো থাকছে বুলগেরিয়ায় তৈরি রেডিয়েশন ডোজ মনিটর নামে বিকিরণ মাপার যন্ত্র। এছাড়াও থাকছে সুইডেনের অ্যাটম রিফ্লেক্টিং অ্যানালাইজার। এদের পাশাপাশি থাকছে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্র। যেমন, চাঁদের মানচিত্র তৈরি করার জন্য টেরিন ম্যাপিং ক্যামেরা, খনিজ পদার্থ সন্ধান করার জন্য হাইপার স্পেক্টরাল ইমেজার, এক্স-রে স্পেক্ট্রমিটার ইত্যাদি।

২০০৭-০৮ সাল নাগাদ এইসব লটবহর সমেত (সম্মিলিত ওজন যদিও খুব একটি বেশি হবে না) চন্দ্রযানকে পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেইকেল-এর সাহায্যে প্রথমে ডিম্বাকার কক্ষপথে স্থাপন করা হবে, ঠিক যেভাবে কিছুদিন আগে আবহাওয়া সংক্রান্ত খবরাখবর নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল একটি উপগ্রহকে। তারপরে ওইভাবেই দূরত্ব বাড়াতে থাকা হবে যতক্ষণ না তা চাঁদের মহাকর্ষের আওতায় গিয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে ২০০৭-০৮ সালে যে দারুণ একটা ব্যাপার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।


Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.


* Applicable for M.S. Windows XP

Wednesday, 8 August 2007

মাটির ময়না


গত ৩১ -এ জুলাই কলকাতার নন্দন প্রেক্ষাগৃহে 'মাটির ময়না' চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছে। ভারতে এই ছায়াছবিটির বাণিজ্যিক মুক্তিলাভের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪২ বছর পর দুই দেশে চলচ্চিত্র বিনিময়ের শুভ সূচনা ঘটল।
পাকিস্তানের উপনিবেশিকতার জের ধরে দীর্ঘদিন ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলচ্চিত্রের আদান-প্রদান বন্ধ ছিল। কিন্তু এর আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের চলচিত্র ভারতে প্রদর্শণের আইনগত কোনো বাধা নেই।
অজ্ঞতা ও রাজনৈতিক কারণেই এতদিন দুই দেশের মধ্যে ছবির আদান-প্রদান হয়নি। আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত 'মাটির ময়না'র কলকাতায় মুক্তি লাভের মধ্যদিয়ে দুই বাংলার মানুষ সাংস্কৃতিকভাবে আরো কাছাকাছি আসবে, সুস্থ ধারার ছায়াছবির জোয়ার সৃষ্টি হবে, আশা করা যায়।

আজ আমি ও আমার বন্ধু হাবিবুর নন্দন প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে 'মাটির ময়না' চলচ্চিত্রটি দেখে এলাম। বেশ ভাল লাগল। তবে আমরা সাধারণত আড়াই/তিন ঘন্টার ছায়াছবি দেখতে অভ্যস্ত তাই স্বল্প দৈর্ঘ্যের (মাত্র দেড় ঘন্টা) এই চলচ্চিত্রটি দেখে যেন মন ভরলো না।

বাংলাদেশে এই ছায়াছবিটি হয়ত অনেকেই দেখেছেন, তাই নতুন করে এর পটভূমিকা আর বললাম না। ছবিটি দেখে আমার মনে হল যে এর গল্পকার তথা নির্দেশক/পরিচালক, তারেক মাসুদ এই বার্তাটিই দিতে চেয়েছেন যে - আমরা বাঙ্গালিরা আত্মপরিচয়ের অভাবে (identity crisis) ভুগি। বুঝি না যে আমাদের প্রধান পরিচয় কী? আমরা আগে হিন্দু বা মুসলমান না আগে বাঙ্গালি। আমাদের সবার মনে রাখা দরকার যে আমরা আগে বাঙ্গালি। বাঙ্গালিত্ব হচ্ছে আমাদের আত্মপরিচয়। সোনার পাথরবাটি বলে কিছু হয় না। হয় সোনার বাটি কিম্বা পাথরের বাটি। সেইরকম হিন্দু সৌভ্রাতৃত্ব বা মুসলমান সৌভ্রাতৃত্বও কাল্পনিক বস্তু। বাঙ্গালি সৌভ্রাতৃত্বই হল আসল।

এই চলচ্চিত্রটি দেখে আমার একটাই কথা মনে হল - আর কত দিন? আর কত দিন আমরা পরস্পর ভেদাভেদ করবো? একে অপরকে ঘৃণা করবো? তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবো?


নন্দন ১ প্রেক্ষাগৃহে মাটির ময়নার বিজ্ঞাপন দেওয়াল চিত্র



নন্দন প্রেক্ষাগৃহের সামনে আমি (২)




নন্দন প্রেক্ষাগৃহের সামনে হবিবুর রহমান (আমার বন্ধু)




Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Tuesday, 31 July 2007

বিষণ্ণ গরাদ ছুঁয়ে আকাশের স্বপ্ন ছবি চোখে এঁকো


ভালো থেকো,
ভালো রেখো,
ভালো থাকা ও রাখা বড় ভালোকথা।
হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে
কাপাসতুলোর মতো
যাবতীয় ঘুণধরা ব্যথা।
ভালো থেকো,
ভালো রেখো,
ভালো থাকা ও রাখা বড় ভালোকথা।

ভালো আছো?
ভালো থাকা কাকে বলে জানো?
তুমি কি গহীন রাতে
মাদলের তীব্র ধ্বনি শুনেছো কখনো?
দেখেছো কখনো অহঙ্কারী যামিনী কালো
কিরকম তীব্র ক্ষোভে জ্বলে শশী অসংবৃত হয়ে
না কি তুমি সেইক্ষণে ভিন্ন ছাঁদে পড়েছিলে ঘুমিয়ে?

ভালো থেকো,
ভালো রেখো,
ভালো থাকতে ও রাখতে শেখো,
বিষণ্ণ গরাদ ছুঁয়ে
আকাশের স্বপ্ন ছবি চোখে এঁকো।।



Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Sunday, 29 July 2007

History of Bikrampur (East Bengal)

Bikrampur the political and cultural centre of ancient Bengal survives only in the name of an area in the Munshiganj district of Bangladesh. The remains of the city of Bikrampur, the capital of the ancient kingdoms of southeastern Bengal, are lost and its location can only be guessed on the basis of available data.

The name of Bikrampur survived in the name of a pargana in the Mughal period. It appears in Todarmal's settlement in the 16th century yielding revenue of Rs 83,376. By 1728 the revenue had increased to Rs 1,03,001, and to decrease again in 1763 to Rs 24,568, partly due to creation of two new parganas, Rajnagar and Baikunthapur, out of it and partly due to the destructive activity of the Padma. Today the name does not exist even officially; but the inhabitants of a vast tract of land in the Munshiganj district still feel pride in saying that they belong to Bikrampur, which, of course, emanates from the past glory of the area.

In the ancient period Bikrampur was undoubtedly the most important political centre in the Banga janapad. Indeed, it was the capital city of the Chandra, Barman, Sen, rulers, from the beginning of the 10th century AD to the beginning of the 13th century AD. Bikrampur appears for the first time in the copperplates of Shrichandra as sa khalu shrivikramapura samavasita shrimajjayaskandhavarat (from the royal camp of victory or capital situated at Bikrampur) and it held that position through the rule of the subsequent Varman and Sen dynasties.

Even during the rule of the Sens, who held sway over practically the whole of Bengal, Bikrampur continued to be their capital, and Laksmansen came to this place after his defeat at Nadia at the hands of the Muslim invader Bakhtiyar Khalji, where his two sons, Vishwarupsen and Keshabsen ruled for a short period. Though the copperplates of Vishwarupsen and Keshabsen do not mention Bikrampur as the capital, but the land granted by them lay in Bikrampur bhage, indicating their hold over the area. Bikrampur's eminence continued till the early 1280s, when Danujmadhab Dasharathdeb or Dhanuj Rai of Ziauddin Barani transferred his capital to nearby Subarnagram (Sonargaon). From then onwards, throughout the Sultanate period, it remained in oblivion, only to make a comeback as the name of a pargana in the Mughal revenue roll. The heroic resistance to Mughal aggression put up by Chand Rai and Kedar Rai, the zamindars of Bikramapur (two of the illustrious Baaro-bhuiyans of Bengal) added short-lived glory to Bikrampur.

Today Bikrampur is an extensive region of the Munshiganj district, and at some point of time it extended over some parts of Faridpur across the Padma. However, it must be said that it is difficult to ascertain the exact boundary of the territorial unit of that name. On the basis of the geophysical characteristics of the area an attempt can be made without any claim for exactitude. In the Thakbast Surveys map (1845-1877) there is no mention of the Kirtinasha (the Padma just before meeting the Meghna). Bikrampur comprised the area with the Padma on the west, the Dhaleshwari on the north and east, and the confluence of the Arial river and the Meghna on the south. A local poet Lala Ramgati in his Mayatimirchandrika mentions that Brahmin Pandits abound in the beautiful rajya named Bikrampur, which lies between the Brahmaputra mahatirtha on the east and the Padmabati on the west.

The small river Kaliganga (shown in James Rennel's map of 1781) flowed through the middle of the tract, and on its either bank grew the prosperous villages of Idrakpur (Munshiganj), Firingibazar, Abdullapur, Mirganj, Serajdi, Sekernagar, Hasara, Sholaghar, Baraikhali, Thaodiya, Baligaon, Rajabadi etc on the north and Mulfatganj, Karatikal, Japsa, Kandapada, Shyamsundar, Khilgaon, Sarenga, Chikandi, Ganganagar, Radhanagar, Rajnagar, Ghagariya, Larikul etc on the south. The Padma, however, played havoc in the area in the 17th century and by devouring the glorious deeds of Chand Ray and Kedar Ray earned the epithet of Kirtinasha, the destroyer of relics. The Kaliganga cut through the middle of the tract dividing it into two parts: Uttar Bikrampur and Dakshin Bikrampur. About 200 years ago Bikrampur was about 30 to 40 miles from east to west and about 8 to 10 miles from north to south.

The site of the city of Bikrampur has been identified with the Rampal area not far from the modern town of Munshiganj. It has been estimated on the basis of the archaeological exploration of the area that the ancient capital covered about 15 square miles, on which are situated some 17 or 18 villages. To the north is the Ichhamati river, and there still stand the remains of a very high parapet running east to west, parallel with the ancient course of the river. To the east is the ancient stream of the Brahmaputra. There are two wide moats, one on the west and one on the south, which in present times are known respectively as the Mirkadim canal and the Makuhati canal. The royal palace, known as the Ballaalbaadi, on high ground within the mud-fort citadel, with a 200 feet wide ditch around it, is now in ruins.

A large number of tanks, mostly dating from pre-Muslim period, can be seen around Rampal, but hardly any building of that period except the derelict ruins of temples; NK Bhattashali identified in 1929 the remains of as many as 30. Dhipur and Sonarang are the two important temple sites mentioned by him. RD Banerji also noticed structures in nearby Raghurampur. Bajrayogini, a nearby village, was the birthplace of famous Buddhist scholar Atish Dipankar Shreegnan. The whole area yielded highly valuable antiquities: sculptures of exquisite quality (both Hindu and Buddhist), objects of precious metals. A silver Bishnu image from this area (Churain) is now preserved in the Indian Museum. An eleventh century divine nymph (surasundari) hewn out of a long wooden pillar and forming a part of a column (now preserved in the Bangladesh National Museum) is considered to be a unique find in the whole sub-continent. Two other wooden pillars with sculptural decorations were found from the famous Rampal Dighi (2200 ft x 840 ft). Though the present landscape around Rampal would not give any indication of the existence of a metropolis in the distant past, the find of the antiquities and the legends around speak of the past glory of the ancient city. The river system around might have also contributed to the extinction of the once prosperous city. However, the medieval ruins of a mosque and tomb of Baba Adam Shahid at Rampal now stand as the only visible historical monuments in the area.

Whether the name of the village Rampal has any connection with the famous Pal king of that name is difficult to ascertain. It is known from epigraphical records that the Barman king BhojBarman or SamalBarman propitiated the friendship of the Pal king, Ramapal by offering him elephants and chariots. It may be that Rampal visited Bikrampur and the area near the palace where he was ceremoniously received was developed and named after him. It is unlikely that Rampal had Bikrampur area under his control. There is a local tradition that the area was named Rampal after a local merchant. Ramananda Pal, popularly called Rampal, was the grocer to the royal family during Ballalsen's rule, and he amassed wealth, settled down in the neighbourhood of the royal palace and came to be recognised as a respectable person. When Ballalsen dug his dighi, it stretched up to Ramapal's house. A local proverb goes like this: Ballal katay dighi name Rampal (the tank was excavated by Ballal, but it got the name of Rampal).


Bibliography Dilip K Chakrabarti, Ancient Bangladesh, Dhaka, 1992; Jogendranath Gupta, Bikrampurer Itihas (in Bangla), Kolkata, 1405 BS.

Friday, 8 June 2007

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি


আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।

তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন
অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন
পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা,
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।

আমি উচ্চারিত সত্যের মতো
স্বপ্নের কথা বলছি।
উনুনের আগুনে আলোকিত
একটি উজ্জ্বল জানালার কথা বলছি।
আমি আমার মা'য়ের কথা বলছি,
তিনি বলতেন প্রবহমান নদী
যে সাঁতার জানে না তাকেও ভাসিয়ে রাখে।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নদীতে ভাসতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মা'য়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি
গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।
ভালোবাসা দিলে মা মরে যায়
যুদ্ধ আসে ভালোবেসে
মা'য়ের ছেলেরা চলে যায়,
আমি আমার ভাইয়ের কথা বলছি।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্তানের জন্য মরতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সূর্যকে হৃদপিন্ডে ধরে রাখতে পারে না।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল
কারণ তিনি ক্রীতদাস ছিলেন।

আমরা কি তাঁর মতো কবিতার কথা বলতে পারবো?
আমরা কি তাঁর মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো?

তিনি মৃত্তিকার গভীরে
কর্ষণের কথা বলতেন
অবগাহিত ক্ষেত্রে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপনের কথা বলতেন
সবত্সা গাভীর মত
দুগ্ধবতী শস্যের পরিচর্যার কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

যে কর্ষণ করে তাঁর প্রতিটি স্বেদবিন্দু কবিতা
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
শস্যহীন প্রান্তর তাকে পরিহাস করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাতৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্ষুধার্ত থেকে যাবে।

যখন প্রবঞ্চক ভূস্বামীর প্রচন্ড দাবদাহ
আমাদের শস্যকে বিপর্যস্ত করলো
তখন আমরা শ্রাবণের মেঘের মত
যূথবদ্ধ হলাম।
বর্ষণের স্নিগ্ধ প্রলেপে
মৃত মৃত্তিকাকে সঞ্জীবিত করলাম।
বারিসিক্ত ভূমিতে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করলাম।
সুগঠিত স্বেদবিন্দুর মত
শস্যের সৌকর্য অবলোকন করলাম,
এবং এক অবিশ্বাস্য আঘ্রাণ
আনিঃশ্বাস গ্রহণ করলাম।
তখন বিষসর্প প্রভুগণ
অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করলো
এবং আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট তাম্রলিপির মত
রৌদ্রালোকে উদ্ভাসিত হলাম।
তখন আমরা সমবেত কন্ঠে
কবিতাকে ধারণ করলাম।
দিগন্ত বিদীর্ণ করা বজ্রের উদ্ভাসন কবিতা
রক্তজবার মত প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
পরভৃতের গ্লানি তাকে ভূলুন্ঠিত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
অভ্যুত্থানের জলোচ্ছ্বাস তাকে নতজানু করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
পলিমাটির সৌরভ তাকে পরিত্যাগ করবে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তিনি স্বপ্নের মত সত্য ভাষণের কথা বলতেন
সুপ্রাচীন সংগীতের আশ্চর্য ব্যাপ্তির কথা বলতেন
শস্যের নক্ষত্রের আলোকিত প্রান্তরের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

যখন কবিকে হত্যা করা হল
তখন আমরা নদী এবং সমুদ্রের মোহনার মত
সৌভ্রাত্রে সম্মিলিত হলাম।
প্রজ্জ্বলিত সূর্যের মত অগ্নিগর্ভ হলাম।
ক্ষিপ্রগতি বিদ্যুতের মত
ত্রিভূবন পরিভ্রমণ করলাম।
এবং হিংস্র ঘাতক নতজানু হয়ে
কবিতার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলো।
তখন আমরা দুঃখকে ক্রোধ
এবং ক্রোধকে আনন্দিত করলাম।

নদী এবং সমুদ্রে মোহনার মত
সম্মিলিত কন্ঠস্বর কবিতা
অবদমিত ক্রোধের আনন্দিত উত্সারণ কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে তরঙ্গের সৌহার্দ থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
নিঃসঙ্গ বিষাদ তাকে অভিশপ্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মূক ও বধির থেকে যাবে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল
আমি একগুচ্ছ রক্তজবার কথা বলছি।

আমি জলোচ্ছ্বাসের মত
অভ্যুত্থানের কথা বলছি
উৎক্ষিপ্ত নক্ষত্রের মত
কমলের চোখের কথা বলছি
প্রস্ফুটিত পুষ্পের মত
সহস্র ক্ষতের কথা বলছি
আমি নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননীর কথা বলছি
আমি বহ্নিমান মৃত্যু
এবং স্বাধীনতার কথা বলছি।

যেদিন রাজশক্তি আমাদের আঘাত করলো
তখন আমরা প্রাচীণ সংগীতের মত
ঋজু এবং সংহত হলাম।
পর্বত শৃংগের মত
মহাকাশকে স্পর্শ করলাম।
দিকচক্রবালের মত
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলাম;
এবং শ্বেত সন্ত্রাসকে
সমূলে উত্পাটিত করলাম।

তখন আমরা নক্ষত্রপুঞ্জের মত
উজ্জ্বল এবং প্রশান্ত হলাম।

উৎক্ষিপ্ত নক্ষত্রের প্রস্ফুটিত ক্ষতচিহ্ন কবিতা
স্পর্ধিত মধ্যাহ্নের আলোকিত উম্মোচন কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নীলিমাকে স্পর্শ করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মধ্যাহ্নের প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত হতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্ত্রাসকে প্রতিহত করতে পারে না।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি শ্রমজীবী মানুষের
উদ্বেল অভিযাত্রার কথা বলছি
আদিবাস অরণ্যের
অনার্য সংহতির কথা বলছি
শৃংখলিত বৃক্ষের
উর্দ্ধমুখী অহংকারের কথা বলছি,
আমি অতীত এবং সমকালের কথা বলছি।
শৃংখলিত বৃক্ষের উর্দ্ধমুখী অহংকার কবিতা
আদিবাস অরণ্যের অনার্য সংহতি কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানে না
যূথভ্রষ্ট বিশৃংখলা তাকে বিপর্যস্ত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
বিভ্রান্ত অবক্ষয় তাকে দৃষ্টিহীন করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম হীনমন্য থেকে যাবে।

যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম
তখন চতুর্দিকে ক্ষুধা।
নিঃসঙ্গ মৃত্তিকা শস্যহীন
ফলবতী বৃক্ষরাজি নিস্ফল
এবং ভাসমান ভূখন্ডের মত
ছিন্নমূল মানুষেরা ক্ষুধার্ত।

যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম
তখন আদিগন্ত বিশৃংখলা।
নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননী শোকসন্তপ্ত
দীর্ঘদেহ পুত্রগণ বিভ্রান্ত
এবং রক্তবর্ণ কমলের মত
বিস্ফোরিত নেত্র দৃষ্টিহীন।
তখন আমরা পূর্বপুরুষকে
স্মরণ করলাম।
প্রপিতামহের বীর গাঁথা
স্মরণ করলাম।
আদিবাসী অরণ্য এবং নতজানু শ্বাপদের কথা
স্মরণ করলাম।

তখন আমরা পর্বতের মত অবিচল
এবং ধ্রুবনক্ষত্রের মত স্থির লক্ষ্য হলাম।

আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি স্থির লক্ষ্য মানুষের
সশস্ত্র অভ্যুত্থানের কথা বলছি
আমি শ্রেণীযুদ্ধের অলিন্দে
ইতিহাসের বিচরণের কথা বলছি
আমি ইতিহাস এবং স্বপ্নের কথা বলছি।

স্বপ্নের মত সত্যভাষণ ইতিহাস
ইতিহাসের আনন্দিত অভিজ্ঞান কবিতা
যে বিনিদ্র সে স্বপ্ন দেখতে পারে না
যে অসুখী সে কবিতা লিখতে পারে না।

যে উদ্গত অংকুরের মত আনন্দিত
সে কবি
যে সত্যের মত স্বপ্নভাষী
সে কবি
যখন মানুষ মানুষকে ভালবাসবে
তখন প্রত্যেকে কবি।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত বর্তমান
এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি।

খন্ডযুদ্ধের বিপরীতে
আমরা ভূমি কর্ষণ করেছি।
হত্যা এবং ঘাতকের সংকীর্ণ ছায়াপথে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করেছি।
এবং প্রবহমান নদীর সুকুমার দাক্ষিণ্যে
শস্যের পরিচর্যা করেছি।

আমাদের মুখাবয়ব অসুন্দর
কারণ বিকৃতির প্রতি ঘৃণা
মানুষকে কুশ্রী করে দেয়।
আমাদের কণ্ঠস্বর রূঢ়
কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
কণ্ঠকে কর্কশ করে তোলে।
আমাদের পৃষ্ঠদেশে নাক্ষত্রিক ক্ষতচিহ্ন
কারণ উচ্চারিত শব্দ আশ্চর্য বিশ্বাসঘাতক
আমাদেরকে বারবার বধ্যভূমিতে উপনীত করেছে।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমার সন্তানেরা
আমি তোমাদের বলছি।
যেদিন প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ
সূর্যের মত সত্য হবে
সেই ভবিষ্যতের কথা বলছি,
আমি ভবিষ্যতের কবিতার কথা বলছি।

আমি বিষসর্প প্রভুদের
চির প্রয়াণের কথা বলছি
দ্বন্দ্ব এবং বিরোধের
পরিসমাপ্তির কথা বলছি
সুতীব্র ঘৃণার
চূড়ান্ত অবসানের কথা বলছি।

আমি সুপুরুষ ভালবাসার
সুকণ্ঠ সংগীতের কথা বলছি।

যে কর্ষণ করে
শস্যের সম্ভার তাকে সমৃদ্ধ করবে।
যে মত্স্য লালন করে
প্রবহমান নদী তাকে পুরস্কৃত করবে।
যে গাভীর পরিচর্যা করে
জননীর আশীর্বাদ তাকে দীর্ঘায়ু করবে।
যে লৌহখন্ডকে প্রজ্জ্বলিত করে
ইস্পাতের তরবারি তাকে সশস্ত্র করবে।

দীর্ঘদেহ পুত্রগণ
আমি তোমাদের বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি
বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
ভাইয়ের যুদ্ধের কথা বলছি
আমি আমার ভালবাসার কথা বলছি।
আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি।

সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা
সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো?
আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো?


--- আবু জ়াফর ওবায়দুল্লাহ্‌


Best viewed by AdorshoLipi font. If not installed in your system, then download and paste the font file in [Fonts] folder. Go to Control Panel, Switch to Classic View (if Control Panel is in Category View, otherwise skip this step)*, right click on Fonts folder and paste.

* Applicable for M.S. Windows XP

Blog Archive